রংপুর: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা দিলেও, কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। এই পরিবর্তন ছাড়া কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়—এই মতামতই উঠে এসেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর গোল টেবিল বৈঠকে।
বক্তারা জানান, রাজনৈতিক ঐকমত্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হলে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবির্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে। এই বৈঠকের মতামতগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলে আয়োজকরা ঘোষণা করেন।
রোববার (৩০ নভেম্বর) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত রংপুর নগরীর একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে ‘সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ: নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে এসেছে। সুজনের রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ছাত্র-শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সুজনের জাতীয় স্তরের নির্বাচন সংস্কার প্রস্তাব অনুসারে, এই ধরনের আঞ্চলিক আলোচনা নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ, যা দেশব্যাপী ২০টিরও বেশি জেলায় অনুরূপ বৈঠকের মাধ্যমে চলছে।
গোল টেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, সবার গ্রহণযোগ্য একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যা জবাবদিহিমূলক, জনকল্যাণমূলক এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করবে। এতে পুরোনো বন্দোবস্ত বা ফ্যাসিবাদী শাসনের কোনো সুযোগ থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ইস্যু-ভিত্তিক মতভেদ থাকলেও, স্বৈরাচার রোধে পারস্পরিক ঐক্য ও সহনশীলতা অপরিহার্য।
সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জুর সভাপতিত্বে বৈঠকে সুজনের রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট, সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হায়দার এবং দি হাঙ্গার প্রজেক্টের রংপুর অঞ্চল সমন্বয়কারী রাজেশ দে রাজু বক্তব্য দেন।
ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সুজনের রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন। সুজনের মহানগর কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুকের সঞ্চালনায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সুজন নেতারাসহ সুশীল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সচেতন, সংগঠিত এবং সোচ্চার নাগরিক সমাজের কোনো বিকল্প নেই। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর না করলে কেবল নির্বাচন দিয়ে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বৈঠকে আলোচিত প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে- সংস্কার কার্যক্রমের ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন এবং স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিরোধ, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিচার এবং সংবিধানের সমসাময়িকীকরণ, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং দুর্নীতি দমন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে একত্রিত করে জনআকাঙ্ক্ষা-ভিত্তিক উন্নয়নের দাবি।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন- অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব সুশান্ত চন্দ্র খা, প্রভাষক ড. নাসিমা আক্তার, হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও সংগঠক আনোয়ারা ইসলাম রানী, নারী সংগঠক মঞ্জুশ্রী সাহা এবং লেখক আদিল ফকির। তারা সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং সংখ্যালঘু-নারীদের অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেন। আনোয়ারা রানী বলেন, ‘সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর শুনতে হবে, না হলে গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’
আয়োজক সংগঠন জানায়, এই গোল টেবিল থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো নির্বাচনি দলগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে নাগরিকের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয় এবং সুষ্ঠু উত্তরণ নিশ্চিত হয়। এই ধরনের আলোচনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে বলে আশা করা হচ্ছে।