Wednesday 07 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

র‌্যাব ২৫, পুলিশ ২৩ শতাংশ গুমের সঙ্গে জড়িত: কমিশন প্রতিবেদন

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৪ | আপডেট: ৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৫

ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: দেশে সংঘটিত গুমের অভিযোগের সঙ্গে র‌্যাব ২৫ শতাংশ, পুলিশ ২৩ শতাংশ ও অন্যান্য বাহিনী ৫৩ শতাংশের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত গুম কমিশন।

কমিশন বলেছে, অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র‍্যাব জড়িত, এরপর পুলিশ ২৩ শতাংশ। এছাড়াও ডিবি, সিটিটিসি, ডিজিএফআই ও এনএসআই ব্যাপকহারে গুম করেছে। বহু ক্ষেত্রে সাদাপোশাকধারী বা “প্রশাসনের লোক” পরিচয়ে অপহরণ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর ধরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দ্বারা একক ও যৌথ অভিযানে সংঘটিত হয়েছে, যা বিচ্ছিন্ন অসদাচরণের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় সমন্বিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয়।

বিজ্ঞাপন

কমিশন বলেছে, কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর ধারা ৩-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অত্র কমিশন গঠিত হয়েছে যার ম্যান্ডেট হলো ০৬ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ০৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে বলপূর্বক গুমের ঘটনাসমূহ অনুসন্ধান করা, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও শনাক্ত করা এবং কোন পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা নির্ধারণ করা। কমিশন তার ম্যাজেট অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি ও তথ্য পর্যালোচনা, পরিদর্শন ও যাচাই বাছাই (Verify) করাসহ স্বীকৃত ও গোপন উভয় ধরনের আটক কেন্দ্র পরিদর্শন করে- যার মধ্যে ছিল DGFI ও RAB পরিচালিত JIC ও TFIC, RAB সদর দপ্তর ও ব্যাটালিয়ন, NSI, DB, CTTC, পুলিশ লাইন্সসহ ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা।

অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া মাত্রই কমিশন তা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় রাখার নির্দেশনা প্রদান করে। কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআই’র জেআইসি (আয়নাঘর) এবং র‍্যাব সদর দফতরের টিএফআইসি পরিদর্শন করে আলামত ধ্বংসের প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে সংশ্লিষ্ট ভিকটিমদের উপস্থিতিতে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সম্মানিত সদস্য এই দুটিসহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।

কমিশনে দাখিলকৃত ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্য হতে একাধিকবার দায়েরকৃত ২৩১টি অভিযোগ এবং যাচাই-বাছাইঅন্তে প্রাথমিক ইনকোয়ারির পর গুমের সংজ্ঞার বহির্ভূত বিবেচনায় ১১৩টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে মোট ১,৫৬৯টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় ছিল যার মধ্যে ২৫১ জন নিখোঁজ (যাদের সন্ধান এখন পাওয়া যায় নি) এবং ৩৬ জনের গুম পরবর্তী লাশ উদ্ধার হয়। নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন সংশ্লিষ্ট বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ২২২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের নিকট থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের পর ভারত হতে বাংলাদেশে পুশইন করা ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করলেও তাতে গুমের শিকার কোন ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২২ ডিসেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে ঢাকার ধামরাইয়ের বাসিন্দা, ঘুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে পুশইন করার একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়াও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক ১ম দফায় ১০৫২ জন ও ২য় দফায় ৩২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা কমিশন প্রাপ্ত হলেও তা যাচাই এর পর গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। উক্ত তালিকার কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট হওয়ায় বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণশুনানি আয়োজনের বিষয়ে সুধিজনের পরামর্শ পাওয়া গেলেও, ভিকটিম ও তাঁদের পরিবারের জীবন, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় কমিশন গোপনীয়ভাবে জবানবন্দী গ্রহণকেই ন্যায়বিচারের জন্য অধিকতর সমীচীন বলে মনে করে।

কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১০এ অনুযায়ী গুম সংক্রান্ত অভিযোগসমূহের মধ্য থেকে ফিরে না আসা ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত দুই থেকে পাঁচ দিনের গুমের অভিযোগগুলোর তদন্তক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। গ্রহণের জন্য পৃথকভাবে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে অগ্রগতি মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য ক্রাইম সিন, পিক-আপ প্রেস, আয়নাঘর ও ডাম্পিং প্রেস পরিদর্শন করেছে। মুন্সিগঞ্জে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থান পাওয়া গেছে যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ সুরতহাল প্রতিবেদনে এটি প্রমাণিত যে দাফনকৃত লাশের মাথায় গুলি এবং দুই হাত পিছমোড়া করে বাধা অবস্থায় ছিল। এছাড়াও বরিশালের বলেশ্বর নদীতে এবং বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং প্লেসের। সন্ধান পাওয়া গেছে। বরিশালে দুটি দেহ উত্তোলন ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন এ কাজের সূচনা করে এবং অজ্ঞাত মরদেহের ছবি ব্যবহারে আজুমান মুফিদুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে। কমিশন অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্ত করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে।

কমিশন গুমের ভিকটিম ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের অধিক বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং বেশ কিছু প্রেস ব্রিফিং এর আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালযের মাধ্যমে গুম বিষয়ক এক ঘণ্টার প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করা হয়। কমিশন দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ত থেকেছে; সবাই গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেন।

কমিশন ইতিপূর্বে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেয়, যেখানে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পুনরাবৃত্তি রোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ প্রণয়নে সহায়তা করে।

পরিশেষে, কমিশন বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্তকরণ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব থেকে সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সমাজভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়ন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন্স আইন, ২০০৩-এর ১৩ ধারা বাতিল, সকল বাহিনীকে কঠোর আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা, বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তরের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সারাবাংলা/ইউজে/এসআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর