ঢাকা: ব্যাংক খাতের সংস্কারের পরিসরে এবার নজর পড়ল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দিকে। একীভূত হয়ে যাওয়া পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের পর বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে কঠোর সিদ্ধান্তের পথে হাঁটছে। গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূন্য করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এই ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর (নন-ভায়াবল) ঘোষণা করা হবে। এরপর ফরেনসিক অডিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থান-নেট অ্যাসেট ভ্যালু নির্ধারণ করা হবে। গভর্নরের ভাষায়, এই মুহূর্তে ঠিক কতটা নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদের মূল্য, তা এখনো জানা নেই। অডিটের ফল সামনে এলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অনিয়ম ও দায়ভার সামলাতে না পারার কারণেই এই সিদ্ধান্ত। গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য।
গভর্নর আরও জানান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য ইতোমধ্যে ‘ব্যাংকিং রেজুলেশন ডিভিশন’ গঠন করা হয়েছে। এই বিভাগের দায়িত্ব হবে-যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত দুর্বল হয়ে পড়বে, তাদের বিষয়ে সময়োপযোগী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও নতুন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবসান নয়; বরং দেশের আর্থিক খাতে জবাবদিহি ও শৃঙ্খলার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। শেয়ার শূন্য হওয়ার অর্থ বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠিন বাস্তবতা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে-এ রকম ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) বেশির ভাগই গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান সমস্যায় রয়েছে; যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এর মধ্যে চারটিই বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সাইফুল আলম বা এস আলমেরও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সব মিলিয়ে এ ধরনের ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) নিবন্ধন সনদ বা লাইসেন্স বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব প্রতিষ্ঠানের যে ঋণ রয়েছে, তার বিপরীতে জামানতও খুবই কম। ফলে সেগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো: পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য সরকারের কাছে ৫ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের শোধ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ৯টি প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের। ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা আটকা পড়েছে পিপলস লিজিংয়ে। এ ছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকা রয়েছে সাধারণ আমানতকারীদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রথমে ২০টি এনবিএফআই বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ১১টি এনবিএফআই ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। তাতে সন্তুষ্ট হয়ে সেগুলোকে আপাতত ছাড় দেওয়া হয়েছে।