ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসছে। ভয়-আতঙ্কে ব্যাংক থেকে তুলে নেয়া টাকা আবার রাখছে ব্যাংকে। তাই ব্যাংকের বাইরে তথা মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ গত জুন মাস থেকে ধারাবাহিক কমছে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার পর যা আর ব্যাংকে ফেরত আসে না, তা-ই ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা হিসেবে পরিচিত।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা কমেছে ৪ হাজার ২৭৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ব্যাংকে ফিরতে শুরু করে মানুষের হাতে রাখা টাকা। যেটার ধারাবাহিকতা চলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। পরের মাস মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ আবার বেড়ে যায়। এরপর এপ্রিলে এসে সেটা আবার কমে। এরপর মে মাস থেকে জুন পর্যন্ত আবার বাড়ে। জুলাই থেকে সেটা আবার ধারাবাহিক কমছে। একই সঙ্গে অক্টোবরে ছাপানো টাকা (রিজার্ভ মানি) কমেছে ৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম-দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থার সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ ব্যাংকে রাখা টাকা তুলে নিয়ে বাসায় রাখতেন। এতে করে ব্যাংকগুলোতে দেখা দিয়েছিল চরম তারল্য সংকট। এমন অবস্থায় ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ শুরু করে। কিন্তু এতেও কাজে আসেনি। প্রতি মাসেই বাড়ছিল মানুষের হাতে নগদ টাকা তথা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত মানুষের হাতে নগদ টাকা বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। তবে গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করে।
এ বিষয়ে কথা বললে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, মানুষের হাতে রাখা টাকা ব্যাংকে ফিরে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য ভাল খবর। টাকাগুলো মানুষের হাতে থাকলে তো আর বিনিয়োগ হয় না। বিনিয়োগ না হলে দেশেরও উন্নতি হয় না। এছাড়া ব্যাংক খাতের জন্যও এটা সুখবর। ব্যাংকগুলোর উপর মানুষের আস্থা বাড়ছে।
তিনি বলেন, এটাকে ধরে রাখতে হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ভুয়া লোন দেয়া বন্ধ করতে হবে। পাচারকৃত টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বচ্ছ হতে হবে। কারণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা যদি স্বচ্ছ না হয় তাহলে ব্যাংক খাতে সুশাসন আনতে পারবে না। অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হলে ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে। এখন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার এসে কী করে সেটাও দেখার বিষয়। যদি অর্থপাচার বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নিতে পারে তাহলে ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
সর্বশেষ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় অক্টোবরে মানুষের হাতে নগদ টাকা কমেছে ৪ হাজার ২৭৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। অক্টোবরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর আগের সেপ্টেম্বর মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি ২ লাখ টাকা।
এছাড়া, চলতি বছরের জুনে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাড়িঁয়েছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা। পরের মাস জুলাইয়ে আবার কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা। এরপর থেকে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ধারাবাহিক কমছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা টাকার পরিমাণ কমে আসার অর্থই হল ব্যাংক খাতের উপর গ্রাহকদের আস্থা বাড়ছে। কিছু সমস্যার কারণে মানুষ আতঙ্কে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এখন ব্যাংক খাতে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। মানুষের ভয়ও দূর হয়েছে। তাই মানুষ আবার ব্যাংকমুখী হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি এ ধারা অব্যাহত থাকবে। ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। নিয়ম-নীতি মেনে লেনদেন করার জন্যও আমরা ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে বলে দেয়া হয়েছে, মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এমন কাজ করা যাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই মানুষের হাতে নগদ বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ কমতে থাকে। গত বছরের আগস্টে মানুষের হাতে বা ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ, পরের মাস অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস নভেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬ কোটি ৭ লাখ, পরের মাস ডিসেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭১ কোটি ৫ লাখ, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ২৩০ কোটি ৯ লাখ এবং ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের মার্চে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩১ কোটি ৬ লাখ টাকা, এপ্রিলে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর মে মাসে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ জুন মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫১ কোটি ৯ লাখ টাকা, পরের মাস জুলাইয়ে আবার কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা, আগস্টে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি ৬ লাখ টাকা, সেপ্টেম্বরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি ২ লাখ টাকা এবং পরের মাস অক্টোবরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি ৭ লাখ টাকা।
তথ্য মতে, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ধারাবাহিক কমছিল ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকার পরিমাণ। কিন্তু নভেম্বর থেকে আবার বাড়তে শুরু করে। যেটা গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৫ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে সেটা বেড়ে দাড়ায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৮৬০ কোটি, জানুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৯৫ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪ কোটি, মার্চে ২ লাখ ৬১ হাজার ১৯৫ কোটি, এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, মে মাসে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৮ কোটি, জুনে ২ লাখ ৯০ হাজার ৪৩৬ কোটি, জুলাইয়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৩০ কোটি ও আগস্টে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ দশ মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা বেড়েছিল ৪৬ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি কারণে ব্যাংক বাইরে মানুষের হাতা থাকা নগদ টাকার পরিমাণ বাড়ে। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের খরচ বেশি হয়। এজন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখে। এখন মূল্যস্ফীতি আগের চেয়ে কম। তাই মানুষ আর আগের মতো হাতে বেশি টাকা রাখে না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা কম থাকলে। ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির করে ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়ার পর কিছু ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থায় নষ্ট হয়েছিল। ফলে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়েছিল। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসছে। সেই কারণে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা আবার ব্যাংকে ফিরছে।
এদিকে, মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ কমার পাশাপাশি বাজারে মুদ্রা সরবরাহ’র পরিমাণও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক খাতে ছাপানো টাকার স্থিতি (রিজার্ভ মানি) ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। আর পরের মাস অক্টোবরে ছাপানো টাকার স্থিতি কমে দাাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৮৮৭ কোটি ৪ লাখ টাকা। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে মুদ্রা সরবরাহ কমেছে ৭ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা।