Friday 09 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সংখ্যালঘু পরিচয় না দেখে নাগরিক অধিকার ও নির্বাচনী ইশতেহার স্পষ্ট করার তাগিদ

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০০ | আপডেট: ৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:৫৯

-ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সংখ্যালঘু পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা ও নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়নযোগ্যতা— এ তিনটি বিষয় ঘিরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্যে গভীর উদ্বেগ উঠে এসেছে। বক্তারা আলোচনায় সংখ্যালঘু পরিচয় না দেখে নাগরিক অধিকার ও নির্বাচনী ইশতেহার স্পষ্ট করার তাগিদ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (০৮ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অর্ন্তভূক্তিমূলক, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার’ শীর্ষক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এক আলোচনায় বক্তারা এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।

সিজিএস-এর প্রেসিডেন্ট হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন সময়ে নির্যাতিত হয়ে থাকে। তারপরও ঢালাওভাবে মনে করা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিদির্ষ্ট একটি দলের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। যদিও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অতীতে সেই দলের নেতাকর্মীদের দ্বারাই সংখ্যালঘুরা বেশি আক্রমনে শিকার হয়েছেন। অন্যদলগুলোর সংখ্যালঘুর প্রতি আস্থা ফেরাতে না পারা একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা। আগামীতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে এই ধারনা থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হচ্ছে না। বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনা অতীতের নির্বাচনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, সংখ্যালঘু শব্দটি কেবল সংখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট না হলে গণতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

আলোচনায় খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটি নিজেই এক ধরনের অমর্যাদা বহন করে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অনেক দল সংখ্যালঘু হতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সংখ্যালঘু আখ্যা দেয়া বিভাজন বাড়ায়। জনগণের অংশগ্রহণ অবারিত না হলে রাজনৈতিক কাঠামো কেবল অঙ্গীকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এনডিএম মহাসচিব মোমিনুল আমিন বলেন, ‘সংখ্যালঘু প্রশ্নে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি হয়েছে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না থাকলে কোনো সংস্কারই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। নির্বাচনে সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন করে কোনো ফ্যাসিবাদ তৈরি না হয়।’

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক সাইদ ফেরদৌস বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে শুরু থেকেই একটি অংশকে কেন্দ্র করে অন্য অংশকে প্রান্তিক করেছে। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নারীদের প্রার্থী হতে নিরুৎসাহ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর যোগাযোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির প্রধান ও গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য তাসলিমা আখতার বলেন, ‘সংবিধানে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার অধিকারের কথা বলা হলেও বাস্তবে সবাই সেই সুযোগ পায় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের জন্য নাগরিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।’

জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কেন্দ্রীভবনের ফলে অন্যদের ক্ষমতা কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সংখ্যালঘু কমিশন গঠন এবং ভূমি ও সম্পদ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংখ্যালঘুদের কথাও ভাবতে হবে। নির্বাচনে অর্থের প্রভাব ও ভোট কেনার প্রবণতা অন্তর্ভুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।’ সামাজিক চুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশনা ইমাম বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার কেবল আকাঙ্ক্ষার দলিল হলে চলবে না; বাস্তবায়নের পথনকশা স্পষ্ট করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগত বাধা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও ইস্তেহারে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু বিভাজনের বাইরে গিয়ে মৌলিক পরিবর্তনের দিকে নজর দিতে হবে।’ বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘কোনো দেশের গণতন্ত্রের মান নির্ধারিত হয় সেখানকার সংখ্যালঘুরা নিজেদের কতটা নাগরিক মনে করেন তার ওপর। নির্বাচনী ইস্তেহারে কংক্রিট প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকার দেখতে চান নাগরিকরা।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনী অঙ্গীকার একটি লিখিত সামাজিক চুক্তির মতো। ক্ষমতায় গিয়ে সেই চুক্তি রক্ষা না করলে গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সুষ্ঠু নির্বাচন একদিনের বিষয় নয়; ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রম পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রের মান নির্ধারণ করে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর