ঢাকা: অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে ভারতের আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে। ভারতের যে আগ্রাসী একটা ভূমিকা ছিল সব জায়গায়, সেখান থেকে স্বাধীন কন্ঠে কথা বলতে পারছে।
তিনি বলেন, অবশ্যই সমালোচনার কিছু কিছু যৌক্তিক দিক আছে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সমালোচনাটা নির্দয় পর্যায়ে চলে যায়। ১০টা জিনিসের মধ্যে সরকার যদি ৪টা জিনিস করে থাকে, তাহলে যে ৪টা করেছে সেটা বলেন, এরপর যে ৬টা করতে পারে নাই- সেটার জন্য সমালোচনা করেন। কিন্তু এরকম কিছুই দেখবেন না।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক পলিসি ডায়ালগে তিনি এসব কথা বলেন।
বিচার বিভাগের সংস্কারের কথা উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, এখন বিচার বিভাগে পদ সৃষ্টি, বদলি, পদোন্নতি, বাজেট অ্যালোকেশনসহ সবকিছু উচ্চ আদালতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা কি সংস্কার না? রাষ্ট্রের এত বড় একটা অঙ্গের বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটা কোনো সংস্কার না? এটা কি আপনাদের মনে হয় না বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় একসময় ভূমিকা রাখবে? সংস্কার ম্যাজিক লাইট না যে সঙ্গে সঙ্গে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, আমরা একটা গুম কমিশন করেছি। এটা অসাধারণভাবে কাজ করেছে। এই কমিশনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা একটা হিউম্যান রাইটস কমিশন ল করেছি। আমি আপনাদের প্রত্যয়ের সঙ্গে বলি, দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো হিউম্যান রাইটস আইনের চেয়ে আমাদের আইনটা বেটার হয়েছে। আমরা এই আইন অনুযায়ী অচিরেই হিউম্যান রাইটস কমিশনে নিয়োগ দিতে যাচ্ছি। এটা কি কোনো সংস্কার না? আমাদের এই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা ম্যানেজমেন্ট একটা বিশাল ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কিছু কাজের বিবরণ দিয়ে শ্রোতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন উত্থাপন করে উপদেষ্টা বলেন, আমাদের যে রিজার্ভ বেড়েছে, আমাদের যে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আছে, আমাদের যে ব্যাংকিং খাতে ভগ্নপ্রায়, বিধ্বস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং আস্থা ফিরে এসেছে এগুলো কি কোনো সাফল্য নয়? আমাদের যে ২০ হাজারেরও বেশি হয়রানিমূলক মামলা, যেখানে প্রায় ৫ লাখ আসামি ছিল বিরোধীদলের, ভিন্নমতের। সেই মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। এগুলো কি কোনো সাফল্য না?
অনুষ্ঠানের শুরুতে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচন ঘনীভূত হলে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। আইন সহজে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে পরিণত হয়। হামলা, সংঘর্ষ, হুমকি, হয়রানি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে ওঠে। মানুষ গণতন্ত্র ও সংস্কারের কথা বলে। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের ব্যাপারে মানুষ এখনো সন্দিহান, যদিও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসাথে বসার কারণে যথেষ্ট আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশে কি আদৌ আইনের শাসন আছে? মামলা শেষ হতে সময় লাগে বছরের পর বছর। কোথায় আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা? প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের ওপর হামলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চরম ব্যর্থতা ছিল। কোথায় আমাদের নিরাপত্তা? আওয়ামী সময় ধারণা ছিল, কথা বললে হয়তো গুম হয়ে যাবে। কিন্তু এখন মব কালচার চলছে। সরকারের একজন বলেছেন, মব কালচার বলে কিছু নেই, রাষ্ট্র সেটা নিশ্চিত করছে। ৩২ নম্বর ভাঙ্গা হলো, আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি স্থিতিশীল দেশ কীভাবে এসব ঘটে? সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোথায় ছিল? চব্বিশের পর আমরা অনেক ন্যারেটিভ দেখেছি। কিন্তু সংস্কার কমিশনের কাজ তো সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষায় ছিল না। বাংলাদেশে ৫৪ বছরের ইতিহাসে, ভাল নির্বাচনের সংস্কৃতি নেই।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার আপেক্ষিক নয়, মানবাধিকার সর্বজনীন। আমরা জেনেটিক্যালি পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ধারণা করি। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পাবলিক গুডস প্রোডিউস করে। টাকা, ক্ষমতা এবং ধর্ম—এই তিনটি বিষয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পুঁজিকরণ করে চলেছে। রাষ্ট্র মব শক্তি বিকশিত করছে। আগস্টের ৯ তারিখে প্রথম সচিবালয়ে এটি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আয়নারের সামনে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি করছি? রাজনৈতিক দলগুলোকে ইশতেহারে আদিবাসীদের অধিকার থাকতে হবে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সংশোধন হলেও কিন্তু তার প্রয়োগ ঠিকঠাক হচ্ছে না। আগেই কোর্ট কিন্তু অনেকগুলো জামিন দিয়ে দিয়েছে, এই দাবি পুরোপুরি মিথ্যা। আপনারা যারা সাংবাদিক, রিপোর্টিং করছেন গুম খুন নিয়ে। কিন্তু এখন লিখতে চান না কেন? ট্যাগ খাওয়ার ভয়। আমরা গোলটেবিলে বসি, যাতে একটি সাধারণ সহমত আসতে পারে। কিন্তু আমাদের তো কোনো কনসেনসাস বিল্ডিং হচ্ছে না।কাউকে সংখ্যালঘু বলা উচিত নয়। কিন্তু আমাদের তো সবার সমান সুযোগ নেই। জুলাই চার্টার, ইনক্লুশন, মৌলিক অধিকার নিয়ে কথা হচ্ছিল। বলা হচ্ছে সবাই মানুষ। সবাই তো মব সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছে না, নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষ এর শিকার হচ্ছে। আমাদের এটা খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শুভাকাঙ্ক্ষীরা কী অবস্থানে আছে, তারা মত প্রকাশ ও মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে কি না।