Thursday 15 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জামায়াত-চরমোনাই আসন নিয়ে টানাটানি

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:০৫ | আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১০

ঢাকা: নির্বাচন যখন নাকের ডগায়। তখন জামায়াত-আর চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে আসন নিয়ে টানাটানিতে জোট ভাঙার উপক্রম হয়েছে। যদিও জামায়াত চরমোনাই এই জোটকে জোট বলছে না। তারা বলছে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক শক্তির আসন সমঝোতার নির্বাচন। সেই আসন সমঝোতাই এখন ভেঙে যাওয়ার পথে।

সূত্র জানায়, আসন নিয়ে অসন্তোষের কারণেই এ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণে হঠাৎ করেই বুধবার (১৪ জানুয়ারি) জোট ঘোষণা নিয়ে জামায়াতসহ ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়।

বুধবার দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় আসন সমঝোতার জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সই একটি বার্তায় সংবাদ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার তথ্য জানানো হয়। এর আগে, সকালে হামিদুর রহমান আযাদ সই করা অন্য একটি বিজ্ঞপ্তিতে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মুক্তিযোদ্ধা হলে (দ্বিতীয় তলা) সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের কথা জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

তখন বলা হয়, সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলের শীর্ষনেতারা উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু বিকেলে এই সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার পরই শুরু হয় নানা আলোচনা। দিনভর জোট ভাঙ্গার আলোচনাও চলে। কেউ বলে চরমোনাই জোট থেকে বের হয়ে আলাদা জোট করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোট ভাঙ্গার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেউ নেয়নি। তবে সামনে কি হবে তা কেউ বলছে না। সবাই বলছে সমঝোতা চূড়ান্ত করতে আলোচনা চলমান।

সূত্র মতে, বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনসহ ৮টি দলের যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আসন সমঝোতার মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী, গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে একক প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করে সংশ্লিষ্ট লিয়াজোঁ কমিটি। তবে সব দলেরই চাহিদা অনেক বেশি থাকায় তা সমাধানে জটিলতা দেখা দেয়। একপর্যায়ে ৮ দলের সঙ্গে কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এবি পার্টি যুক্ত হয়ে ১১ দলীয় সমঝোতায় রূপ নেয়। সমঝোতা প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় সব দলই বাড়তি আসনে প্রার্থী দেয়। তবে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৪টি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেয়নি।

জানা গেছে, একক প্রার্থী চূড়ান্তের সর্বশেষ প্রক্রিয়ায় সবার আগে জামায়াত-এনসিপি ৩০ আসনে সমঝোতা হয়। বাকিদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনকে ৩১ আসন থেকে কয়েক দফায় বাড়িয়ে ৪৫টি পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়। তবে এতেও তারা রাজি না হয়ে জোট ছাড়ার আভাস দেয়। এ নিয়ে মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) রাতভর দলের শূরা সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করে দলটি। তবে এ সময় ভিন্ন ভিন্ন মত আসায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

পরদিন বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে সেসব মতামত বিশ্লেষণ করতে ডাকা হয় মজলিসে আমেলার বৈঠক (দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম)। সেখানেও জোট ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না এলেও জামায়াতের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করা হয়।

ওই বৈঠক শেষে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেলে প্রেস ব্রিফিংয়ে ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, তাদের দল নির্বাচন কীভাবে করবে, ওয়ান বক্স নীতি কীভাবে বাস্তবায়ন করবে তা দুয়েকদিনের মধ্যে জানানো হবে।

তবে নতুন জোট গঠনের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, সবকিছু বুঝেশুনেই আমরা একটা পথে এগোবো। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকলেও ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগ পর্যন্ত যে কোনো কিছু ঘটতে পারে।

এ সময় তিনি সম্প্রতি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়ার ঐক্যের পাটাতন প্রসঙ্গে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সমালোচনা করে বলেন, এতে সংশয় তৈরি হয়েছে।

গাজী আতাউর রহমান আরো বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করি। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তে এখনো আছি। কেউ যদি আমাদের অবহেলা করে তাহলে সেটাকে তো আমরা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। আত্মমর্যাদাবোধ তো সবারই আছে।

সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন যারা ডেকেছে তারা বলতে পারবে।

এদিকে মাওলানা মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে জামায়াতে ইসলামী ১৫টি আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে। তবে দলটি কমপক্ষে ২৫টি আসন চায়। এ কারণে এ দলটিও সংবাদ সম্মেলনে যেতে রাজি হয়নি। এ দল দুটি সংবাদ সম্মেলনে যেতে রাজি না হওয়ায় তা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র বলছে, গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী আন্দোলন প্রথম ওয়ান বক্স পলিসি নিয়ে কাজ শুরু করে, যেখানে সমঝোতাকারী দলগুলো একটি আসনে একজন প্রার্থীই দিতে পারবে। শুরুতে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে এ আলোচনায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। ষষ্ঠ দল হিসেবে যোগ দেয় জামায়াত।

এরপর জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) সমঝোতার আলোচনায় যুক্ত হয়।

দলগুলোর নেতারা বলছেন, জামায়াত কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছে, যা অন্য দলগুলো ভালোভাবে নেয়নি। যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টিকে (এবি পার্টি) আসন সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে জামায়াত আলাদা করে তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

এসব বৈঠকের আগে অন্য দলগুলোকে কিছুই জানানো হয়নি। এরপর আসন সংখ্যা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের অসন্তোষ প্রকাশ পায়। তবে এলডিপি ও এনসিপি এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে যেদিন সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল সেদিন সেখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে জোট থাকবে কি থাকবে না এ বিষয়ে বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জোট ছিল, জোট আছে, অব্যাহত থাকবে। জোট ভাঙবে— এমন কোনো কিছু হচ্ছে না। যে কারণে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে, তা আবার করা হবে। সমঝোতার বিষয়গুলো দুয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হবে।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও দলের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান সারাবাংলাকে বলেন, আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে জোট গঠন করেছি সেটা যাতে বাস্তবায়ন হয় সেজন্য চেষ্টা চলছে। কেউ কেউ আসন বেশি চাওয়ায় একটু জটিলতা তৈরী হয়েছে। আশা করি ঠিক হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থেই এই জোট টিকে থাকা দরকার। আমি আমার আসন ছেড়ে দিয়ে তাদেরকে বলেছি আপনারা আমার নিজের আসনটিও নিয়ে যান। তবুও জোট টিকিয়ে রাখেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনীতি সচেতন একজন ব্যক্তি বলেন, তেলের সঙ্গে কখনো পানি মেলে না। জামায়াতে ইসলামী আর ইসলামী আন্দোলন অনেকটা তেল আর পানির মতো। এদের মধ্যে ঐক্য হবে না এটা আগে থেকেই জানতাম। তারপরও জামায়াত আর ইসলামী আন্দোলন ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে এক হয়েছিল। কিন্তু কে প্রধানমন্ত্রী হবে আর কারা কত আসন পাবে তা নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। এতেই বোঝা যায় এরা যতটা না ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়ন চায়, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার ভাগ চায়। মূলত এরা কখনোই ক্ষমতার স্বাদ পাবে না।

আরও পড়ুন- ৮০টি আসন চায় ইসলামী আন্দোলন, ভেঙে যাচ্ছে জোট!

বিজ্ঞাপন

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর