ঢাকা: ঢাকার কেরাণীগঞ্জে বাসায় ডেকে নিয়ে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী জোবাইদা রহমান ফাতেমা (১৪) ও তার মা রোকেয়া রহমানকে (৩২) নিজ ঘরে হত্যা করেন গৃহশিক্ষিকা মীম বেগম (২৪)। হত্যার পর ২০ দিন ধরে মরদেহ দু’টির একটি খাটের নিচে ও আরেকটি বাথরুমের সানশেডে রেখে ওই ঘরে-ই স্বভাবিকভাবে বসবাস করে আসছিলেন গৃহশিক্ষিকা এবং তার বোন ও স্বামী। ঋণের ৫০ হাজার টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি ঘিরে লোমহর্ষক এই ঘটনা ঘটিয়েছে গৃহশিক্ষিকা ও তার বোন।
জানা গেছে, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন মেয়ে ফাতেমা ও মা রোকেয়া। ঘটনার পরদিন স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা ছিল ফাতেমার। আর ওই পরীক্ষার প্রশ্ন সহজভাবে সমাধানের জন্যই গৃহশিক্ষিকা মীম বাসায় ডেকে নেয় ছাত্রী ফাতেমাকে। এরকিছু সময় পর ফাতেমা অসুস্থ হয়ে গেছে জানিয়ে মা রোকেয়াকেও বাসায় ডেকে নেন গৃহশিক্ষিকা। যদিও রোকেয়া গৃহশিক্ষিকার বাসায় যাওয়ার আগেই ছাত্রী ফাতেমাকে হত্যা করেন মীম ও তার বড় বোন নুরজাহান বেগম (৩০)। এর পর মা বাসায় গেলে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করেন দু’জন। এই ঘটনার ২০ দিন পর বাড়িটির বাড়িওয়ালা দুর্গন্ধজনিত কারণে পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যার পর গৃহশিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে মা-মেয়ের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রনি চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘কেরাণীগঞ্জ মডেল থানাধীন কালিন্দী ইউনিয়নের মুক্তির বাগ এলাকার একটি ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রোকেয়া রহমান ও বাথরুমের সানশেড থেকে তার মেয়ে ফাতেমার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় পার্শ্ববর্তী এলাকায় গৃহশিক্ষিকার কাছে পড়তে গিয়ে নিখোঁজ হয় স্কুলছাত্রী ফাতেমা। মেয়েকে খুঁজতে বের হয়ে তার মা রোকেয়া রহমানও নিখোঁজ হন। মীম ও তার বোন প্রথমে ফাতেমাকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে রোকেয়া রহমানকে ফোন করে বাসায় ডাকেন মীম, বাসায় আসার পর তাকেও ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তারা মরদেহ ঘরে রেখেই স্বাভাবিক বসবাস করে আসছিল।’
কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি, নিহত রোকেয়া শিক্ষিকা মীমকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দিয়েছিলেন। সেই টাকা চাওয়ায় হয়তো এই হত্যাকাণ্ড। এর পেছনে আরও কোনো কারণ আছে কি না সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
মা-মেয়েকে হত্যার পর ২০ দিন মরদেহ ঘরে রেখেছিল। এই মরদেহ নিয়ে তাদের কী পরিকল্পনা ছিল? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘২০ দিন ঘরে মরদেহ রেখে কীভাবে ছিল সেটি আসলেই ভাবনার বিষয়। তাদের মন মানসিকতা কেমন সেটি নিয়েও প্রশ্ন। তবে এই মরদেহ নিয়ে তাদের কী পরিকল্পনা ছিল সেটি জানা সম্ভব হয়নি। হয়তো কোথাও মরদেহ দু’টি ফেলার মতো সুযোগ তারা পায়নি।’
এ ঘটনায় নিহত রোকেয়ার স্বামী শাহীন আব্দুল্লাহ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত ২৫ ডিসেম্বর বিকেল সোয়া ৫টায় আমার মেয়ে পরদিন ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কী আসতে পারে সেটা জানার জন্য শিক্ষিকা মীমের বাসায় যায়। তিনি ফোন করে বলে যে, ওই স্কুলে লেখাপড়া করেছি, আমি জানি কী আসতে পারে। এটা বলে সে আমার মেয়েকে নিয়ে যায়। তার বাসা থেকে আমাদের বাসার দূরত্ব পাঁচ মিনিটের। পরে সন্ধ্যা ৬টায় আমার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলে, আপনার মেয়ে অসুস্থ হয়ে গেছে, তাকে নিয়ে যান। আসলে তারা ওই সময়ে আমার মেয়েকে খুন করে ফেলেছে। এরপর ওর মা গেলে তাকেও হত্যা করা হয়।’
অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘মেয়ে-স্ত্রীকে খুঁজে না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আমি থানায় জিডি করি। কিন্তু তারপরও কোনো সুরাহা পাচ্ছিলাম না। তারা আমাকে ঠিকভাবে সহযোগিতাটা করে নাই। আমি বার বার বলেছিলাম মরদেহ ঘরের ভেতর আছে। কিন্তু কেউ শুনেনি। তারা ভেবেছিল আমার স্ত্রী মনে হয় কারও সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কী হলো- এখন তো মরদেহ পেল। শিক্ষিকার স্বামী হুমায়ূন আমাকে হুমকি দিয়ে বলেছিল, এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে। বাড়াবাড়ি করলে আমাকে মেরে ফেলবে এবং এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ারও হুমকি দিয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন মরদেহ উদ্ধার করা হয় সেদিন সন্ধ্যায় দেখা করার জন্য আমাকেও ডেকেছিল হুমায়ূন। কিন্তু আমি যাওয়ার আগেই লাশ উদ্ধার। এটা না হলে হয়তো আমাকেও মেরে ফেলত। আমার ফ্যামিলিতে যেহেতু আর কেউ নাই, তাই আমাকে মেরে ফেললে এটা নিয়ে কথা বলার আর কেউ ছিল না। মীম ও তার বোন নুরজাহান এবং তার স্বামী সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। হুমায়ুন পলিথিন নিয়ে এসে নিজে লাশ প্যাকেট করেছিল।’
কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এম সাইফুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘তদন্তে জানা গেছে, নিহত রোকেয়া গৃহশিক্ষিকা মীমকে নিজে ও কয়েকজায়গা থেকে ঋণে টাকা নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ঋণের সেই টাকা ঘিরে তাদের মধ্যে ঝামেলা ছিল। বার বার চাওয়ার পরও হয়তো মীম ঋণের টাকা দিচ্ছিল না। এ সংক্রান্ত কারণে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে। অধিক তদন্তে এ বিষয়ে আরও জানা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘মীমের শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে কর্কশিট দিয়ে ঢাকা রোকেয়ার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর পর পুরো ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে বাথরুমের ফলস ছাদ থেকে শিক্ষার্থী ফাতেমার মরদেহ পাওয়া যায়। মীম ও তার বোন নুরজাহান প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।’