ঢাকা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিসা বন্ড চালুর ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির সরকার। অল্প সময়ের ব্যবধানে ভিসার ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড-ট্রাম্পের কড়াকড়ি আরোপের কারণে বাংলাদেশে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সর্বত্রই আলোচনা চলছে বন্ডের পরপরই ভিসা নিষেধাজ্ঞা কতোটা ক্ষতি করবে বাংলাদেশিদের?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিবাসী ভিসা স্থগিত হলেও সাধারণ ভিসাতে প্রভাব পরবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সরকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ এর সাথে জড়িত দেশের অর্থনীতি।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন বিভাগে মূলত দুই ধরনের ভিসা রয়েছে। একটি হলো ইমিগ্রান্ট বা অভিবাসী ভিসা, অন্যটি হলো নন-ইমিগ্রান্ট ভিসা। অভিবাসী ভিসা হলো সেই ভিসা, যার মাধ্যমে কেউ সরাসরি গ্রিন কার্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে এবং স্থায়ী বাসিন্দা হয়। এর মধ্যে পড়ে পরিবারভিত্তিক গ্রিন কার্ড, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন এবং কর্মভিত্তিক স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন।
নন-ইমিগ্রান্ট ভিসা হলো সাময়িকভাবে থাকার ভিসা। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থী ভিসা, ভিজিট বা ভ্রমণ ভিসা, ওয়ার্ক বা কাজের ভিসা ইত্যাদি। আইনজীবীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়া লাখো বাংলাদেশি অভিবাসীর স্বজনদের আবেদন জমা আছে। তাঁরা বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্র নিতে আবেদন করে রেখেছেন। কেউ কেউ স্বজনের ভিসা পাওয়ার অপেক্ষা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা অধ্যাদেশের কারণে তাঁদের আবেদন প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত থাকবে। পরিবারের সদস্যরা আপাতত যেতে পারবেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৩ অর্থবছরে (অক্টোবর ২০২২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত) বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য মোট প্রায় ৫৯ হাজার ২৫৪টি মার্কিন ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৪ হাজার ৬৭৪টি ছিল নন-ইমিগ্রান্ট ভিসা এবং ১৪ হাজার ৫৮০টি ছিল ইমিগ্রান্ট ভিসা। এই তথ্য থেকে বোঝা যায় যে বেশির ভাগ বাংলাদেশি আবেদনকারী নন-ইমিগ্রান্ট শ্রেণিতেই যুক্তরাষ্ট্রে যান। তাই এই নতুন সিদ্ধান্তে মূল ধাক্কা পড়বে গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারীদের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অফিসের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৯ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে আইনগতভাবে স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৯০ জন বাংলাদেশি। এরপর ২০২০ সালে এটি কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ১০ জনে। করোনা পরিস্থিতির সময় ভিসাপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ২০২১ সালে অনুমতি পান ৬ হাজার ১৮০ জন বাংলাদেশি। এরপর আবার বাড়তে থাকে এটি। ২০২২ সালে ১০ হাজার ১৪০ জন এবং ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ২৪০ জন বাংলাদেশি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান যুক্তরাষ্ট্রে।
কিন্তু সম্প্রতি ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা কার্যক্রম স্থগিতের যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসন নিয়েছে তাতে মার্কিন মুল্লুকে স্থায়ী হওয়ার আশা অনেকটাই ফিকে হওয়ার পথে। সেই হিসেবে যারা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন পরিবারকে সেখানে স্থায়ীভাবে নিয়ে যেতে চান তাদের সমস্যা হবে। উদহারণ হিসেবে কোন পুরুষ সেখানে বর্তমানে গ্রীনকার্ডধারী হিসেবে নিজের স্ত্রী সন্তানসহ অন্যদের ভিসার আবেদন এই ক্যাটাগরিতে পড়বে। ঠিক একইভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রে ওপর পড়বে। অনেকেই মনে করেন, ঠিক কতো ক্ষতিতে পড়বে সেটা সময়ের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক পারভেজ করিম আব্বাসির মতে এখনই সরকারের উচিত বিষয়টি খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, সেটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, ৭৫টি দেশের তালিকায় ভারতের নাম নেই, এমনকি ভিসা বন্ড আরোপের ক্ষেত্রেও ভারত ও পাকিস্তান বাদ পড়েছে। এতে বাংলাদেশের নিজেদের দুর্বলতা খুঁজে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।
নেপালি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও অভিবাসী আইনবিশেষজ্ঞ দিল্লি রাজ ভট্ট বলেন, নতুন ভিসা নীতির ফলে হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার মামলা বহু বছর ধরে ঝুলে আছে, যাঁদের অভিবাসন ভিসা পর্যালোচনার জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছে, যাঁদের সাক্ষাৎকারের সময়সূচি ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে, এমন বহু মানুষ এতে অন্তর্ভুক্ত।
দিল্লি রাজ ভট্ট আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি কত দিন এমন থাকবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই। তবে এ নীতির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলা দায়ের করা হতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে। আদালতের রায় সামনে এলে পরিস্থিতি পরিষ্কার বোঝা যাবে।
তবে অবশ্য ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত না ঘাবড়ানোর পরামর্শ দিয়ে মার্কিন অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ রাজু মহাজন বলছেন, এর মাধ্যমে জট খুলতে পারে নিয়মিত ভিসাসহ অন্যান্য ভিসার। তিনি আরও বলেন, ইমিগ্রেন্ট ভিসা স্থগিত থাকায় দূতাবাসের ওপর চাপ কমবে। ইমিগ্রেন্ট ভিসা স্থগিত থাকায় দূতাবাসের ওপর চাপ কমবে, ফলে নন-ইমিগ্রেন্ট ভিসা প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হতে পারে।
রাজু মহাজন বলেন, ভিজিট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা, ইনভেস্টমেন্ট ভিসা, এমপ্লয়মেন্ট বেস যে ভিসাগুলি আছে—যেমন এফওয়ান, ওওয়ান, এলওয়ান, জেওয়ান, বিওয়ান-বিটু—এই ক্যাটাগরির আবেদনগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে। গত বছর মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১১ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।