ঢাকা: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে চূড়ান্তভাবে কতজন প্রার্থী নির্বাচনি লড়াইয়ে টিকে থাকছেন। কিন্তু ভোটের মূল প্রচার শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা নিয়ে সরব হয়ে উঠেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন সব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে, তারা শতভাগ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। তবে নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসিকে এখনই ‘মাদার অব অল অ্যাকশনে’ যেতে হবে, অন্যথায় নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ত্রিমুখী চাপে নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি।
বিএনপির ‘পোস্টাল ব্যালট’ আতঙ্ক ও পক্ষপাতিত্বের প্রশ্ন: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক শেষে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
বিএনপির দাবি, পোস্টাল ব্যালটের বর্তমান ফরমেট বা প্রতীকের বিন্যাস এমনভাবে করা হয়েছে যা একটি বিশেষ দলকে বাড়তি সুবিধা প্রদান করবে। দলটির আশঙ্কা, প্রবাসীদের ভোট এবং নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ভোটের এই বিশেষ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব থাকলে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) মির্জা ফখরুল বলেন, “আমরা পোস্টাল ব্যালট প্রতীক বরাদ্দের পরে বিতরণের আহ্বান জানিয়েছি। আমরা চাই না প্রশাসনের কোনো স্তরে কেউ বিশেষ সুবিধা পাক। আমরা কমিশনের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না, তবে এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের আলামত স্পষ্ট।
তবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি জানান, দেশের ভেতরের পোস্টাল ব্যালটে সাধারণ ব্যালটের মতোই ব্যবস্থা থাকবে এবং কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে মঙ্গলবার সবগুলো দলের বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিদের নিয়ে ইসি একটি বিশেষ কারিগরি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছে।
জামায়াতের ‘প্রটোকল বৈষম্য’ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, নির্বাচনি মাঠে ‘সমতার নীতি’ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। দলটির নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মো. তাহের সরাসরি অভিযোগ করেছেন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এসপি) ও জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন। বিশেষ করে একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ প্রটোকল ও নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে, তা অন্যান্য দলের জন্য অসম্মানজনক এবং ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে।
জামায়াত দাবি করেছে, তাদের আমিরের জন্যও একই ধরনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই নির্বাচন কোনোভাবেই অংশগ্রহণমূলক বা নিরপেক্ষ হবে না। ইসি অবশ্য জানিয়েছে, নিরাপত্তার ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়, তবে জামায়াত আমিরের নিরাপত্তার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এনসিপির কড়া হুঁশিয়ারি: জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা বৈধ করার বিষয়টিকে তারা কমিশনের ‘দুর্বলতা’ বা ‘গোপন আঁতাত’ হিসেবে দেখছেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “ইসি যদি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে, তবে এই নির্বাচনের দায়ভার অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর বর্তাবে। আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি, বিতর্কিতদের ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।”
ইসির অবস্থান: ‘সবাই যখন নাখোশ, তার মানে আমরা সঠিক’
এতসব অভিযোগের মুখেও বিচলিত নয় এএমএম নাসির উদ্দিনের কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমান মাছউদ সারাবাংলাকে জানান, “আমরা মনে করি, সব দল যখন সমালোচনা করে তখন আমরা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছি। যদি এক দল প্রশংসা করতো আর অন্য দল সমালোচনা করতো, তবে বুঝতাম আমরা কারো দিকে হেলে পড়েছি। যেহেতু সবাই অভিযোগ করছে, তার মানে আমরা কারো মুখাপেক্ষী নই, বরং আইনের পথেই হাঁটছি।”
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে আব্দুর রহমান মাছউদ জানান, কমিশন অত্যন্ত সূক্ষ্ম আইনিভাবেই এই কাজ সম্পন্ন করেছে। তিনি জানান, কমিশন শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের মতামত গ্রহণ করেছে। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২(ক) ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো প্রার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেন, ফি জমা দেন এবং ওই রাষ্ট্রের দূতাবাস যদি তা প্রাপ্তি স্বীকার করে, তবে তাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে। ঋণখেলাপির ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের ডিএলআর রুলিং অনুসরণ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে গ্যারান্টার হওয়ার কারণে কাউকে প্রার্থী হতে বারিত করা যাবে না, যদি না তিনি সরাসরি ঋণগ্রহীতা হন। এই আইনি মারপ্যাঁচের কারণেই প্রায় ৩০ জন প্রার্থী নতুন করে বৈধতা পেয়েছেন।
বিশ্লেষকের চোখে ‘অভিযোগের নির্বাচন’ ও শঙ্কা
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও প্রখ্যাত নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত ও স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু এবারের চিত্র ঠিক উল্টো। নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার আগেই নির্বাচন ভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট ও ঘেরাও কর্মসূচি ঘটছে।
আব্দুল আলীম আরও বলেন, “আমরা যেন একটি ‘অভিযোগের নির্বাচনের’ গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ছি। যদি এখনই কমিশন শক্ত ভূমিকা না নেয় এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে প্রতীক বরাদ্দের পর সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা বাড়ার ঝুঁকি প্রবল। ভোটারদের আস্থায় ফেরাতে প্রয়োজনে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের মতো ‘এক্সট্রিম স্টেপ’ বা চরম পদক্ষেপ নিতে হবে।”
চ্যালেঞ্জের মুখে কমিশন
একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া এখন বর্তমান কমিশনের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। একদিকে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি চাপ, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, সব মিলিয়ে কমিশন এক কঠিন পথে হাঁটছে। কমিশন কি পারবে সব অভিযোগ ছাপিয়ে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে, নাকি ‘নালিশের পাহাড়’ নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চাপা দিয়ে ফেলবে-সে উত্তর এখন সময়ের হাতে।