আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তাদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয়ের পরিমাণেও। গত বছরের অক্টোবরের তুলনায় পরের মাস নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে প্রায় চার গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। একই সময়ে কমেছে ভারতের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে দেশের অভ্যন্তরে বিদেশি নাগরিকদের এবং বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর মাসে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ১৯৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। পরের মাস নভেম্বরে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে বিদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয় বেড়েছে ১৬১ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে যাতায়াত বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্বাচন সামনে এলে এসব দেশের তৎপরতা বাড়ে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব অনেকটাই কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি আসন্ন নির্বাচনেও আগের মতো ভারতের তৎপরতা চোখে পড়ছে না। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতা রয়েছে এবং নির্বাচন উপলক্ষ্যে দেশটির বিভিন্ন প্রতিনিধি দল নিয়মিত ঢাকায় আসছেন। এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয় বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ৪৪ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ব্যয় বেড়েছে ১৪০ কোটি টাকা। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ৩৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ব্যয় বাড়লেও কমেছে ভারতের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছরের অক্টোবরে ভারতের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। পরের মাস নভেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ১৭ কোটি ৯ লাখ টাকায়। অর্থাৎ অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বরে ভারতের নাগরিকদের ব্যয় কমেছে ৮০ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষক হেলাল আহমদ বলেন, মূলত দুই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয় বাড়তে পারে। প্রথমত, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বাংলাদেশে যাতায়াত বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছেন। দ্বিতীয়ত, সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় নির্বাচন উপলক্ষ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসছে। এসব কারণেই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের পর ক্রেডিট কার্ড ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা। গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাজ্যের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ২১ কোটি টাকা। পরের মাস নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসে ব্যয় বেড়েছে ৬ কোটি টাকা।
এদিকে ভারতের নাগরিকদের ব্যয় কমলেও চীনের নাগরিকদের ব্যয় বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে চীনের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছিলেন ৫ কোটি টাকা। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ কোটি টাকায়, যা এক মাসে ১ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্রেডিট কার্ড ব্যয় চার গুণ বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ঠিক কী কারণে এতটা বেড়েছে, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। পরে বিস্তারিত জানানো যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে বিদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের নাগরিকরা খরচ করেছিলেন ৫৩৪ কোটি ২ লাখ টাকা। পরের মাস নভেম্বরে এ ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৫১১ কোটি ২ লাখ টাকায়। অর্থাৎ নভেম্বর মাসে বিদেশে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড লেনদেন কমেছে ২৩ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যার পরিমাণ ৬৯ কোটি ৮ লাখ টাকা। এরপর যুক্তরাজ্যে ৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা, থাইল্যান্ডে ৫২ কোটি ৩ লাখ টাকা, সিঙ্গাপুরে ৫৩ কোটি ২ লাখ টাকা, মালয়েশিয়ায় ৩৫ কোটি টাকা, ভারতে ৩৪ কোটি টাকা, নেদারল্যান্ডসে ২২ কোটি টাকা, সৌদি আরবে ২৮ কোটি টাকা, কানাডায় ১৭ কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ১৭ কোটি টাকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৯ কোটি টাকা, চীনে ২০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য দেশে মোট ৯১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।