ঢাকা: বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সঠিক নেতৃত্বের অপরিহার্য দাবি হলো ঐক্য। জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার স্বার্থে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা এখনই সংস্কার চায় এবং এই সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের সবার।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে জামায়াত আমির বলেন, আজ থেকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। নতুন এ যাত্রায় নাগরিক অংশগ্রহণ, জনগণের ইচ্ছার সুস্পষ্ট প্রকাশ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার যৌথ দায়িত্ব আমাদের সবার ওপরই অর্পিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন এবং জুলাই সনদ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার বিষয়ে অনুষ্ঠিত গণভোটে বাংলাদেশের সর্বস্তরের নাগরিকগণ সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। গণতন্ত্রে জনগণের মতামতই সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে আর এ কারণেই জনমতের প্রতি আমাদের সবারই সম্মান থাকা উচিত।
এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আমরা বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন, আমাদের সাথে থেকেছেন এবং পরিবর্তন সম্ভব বলে বিশ্বাস করেছেন। এজন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই মুহূর্তে বিশেষভাবে সেই তরুণ প্রজন্মের কথা স্মরণ করতে হয়- যাদের সাহস, ত্যাগ এবং একটি উন্নত বাংলাদেশের প্রতি অটল বিশ্বাস আমাদের জাতীয় কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন রূপ দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের তরুণ প্রজন্ম একটি ন্যায়ভিত্তিক, মুক্ত ও রূপান্তরমুখী ভবিষ্যতের জন্য যে সংগ্রাম শুরু করেছিল- তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ও অবিরাম প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার মাধ্যমে আমরা তাদের ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করে যাব ইনশাআল্লাহ।
প্রকৃত জাতীয় নেতৃত্ব কেবল মর্যাদা নয়, বরং জনসেবার একটি মাধ্যম। এর উদ্দেশ্য হলো জনগণকে উন্নত করা, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাদের সর্বোত্তম কল্যাণ নিশ্চিতে কাজ করে যাওয়া। ক্ষমতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি একটি আমানত; আর নেতাদের অবশ্যই স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক আচরণের মাধ্যমে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সঠিক নেতৃত্বের অপরিহার্য দাবি হলো ঐক্য। জুলাই বিপ্লবের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার স্বার্থে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা এখনই সংস্কার চায় এবং এই সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব আমাদের সবার।
নতুন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদের অঙ্গীকার পূরণ না করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনায় আমরা গভীর দুঃখ ও হতাশা প্রকাশ করছি। তারা ইতিপূর্বে সনদে সই করেছিলেন এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন। তাই তাদের আজকের সিদ্ধান্ত আমাদের বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের জনগণ কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য এবং তাদের সামনে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করে।
এক্ষেত্রে আমরা বরাবরই প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পবিত্র দায়িত্ব পালনে অটল রয়েছি। এরই অংশ হিসেবে, আমরা আজ সংসদে শপথ গ্রহণ ও আমাদের স্ব স্ব আসনের প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না, কিন্তু দেশের জনগণকে সর্বোত্তমভাবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আমাদের কাছে এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতীয়মাণ হয়েছে।
আমরা আন্তরিকভাবে আশা করি, নতুন সরকার ও সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শীঘ্রই আমাদের মতো করেই গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রতি তাদের বিশ্বাসের প্রমাণ রাখবেন এবং জনমতের প্রতি যথাযথভাবে সম্মান প্রদর্শন করবেন। সামনে এগোনোর প্রক্রিয়াটি বিভাজন নয়, বরং যৌথ দায়িত্ব ও গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই পরিচালিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট। আমরা প্রত্যাশা করি, জাতি, ধর্ম বা বিশ্বাস নির্বিশেষে আইনের দৃষ্টিতে প্রতিটি নাগরিক এখানে সমান মর্যাদা পাবে। জাতীয় অগ্রগতির কেন্দ্রবিন্দুতে নারীদের অবস্থান নিশ্চিত হবে এবং প্রতিটি নীতি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অন্তর্ভুক্তি ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি সর্বত্রই আরও জোরালো হয়েছে।
জনগণ দুর্নীতিমুক্ত দেশ চায় এবং আমরা সেই অঙ্গীকার দৃঢ়ভাবে ধারণ করবো ইনশাআল্লাহ। বৈশ্বিক সহযোগী ও আঞ্চলিক মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে শান্তি, সহযোগিতা ও যৌথ সমৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশের অঙ্গীকার আগের মতোই অবিচল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র কোনো একটি দিন বা একটি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না; বরং এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা। আমরা দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে সেই যাত্রা অব্যাহত রাখব ইনশাআল্লাহ। যেখানে সম্ভব একমত হয়ে কাজ করব, প্রয়োজন হলে দৃঢ়ভাবে কথা বলব, এবং সবসময় জনগণের স্বার্থে কাজ করব ইনশাআল্লাহ।
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার চেতনাকে সমুন্নত রাখার অংশ হিসেবে আমরা একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করব, যা জনস্বার্থে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্তকে কঠোরভাবে পর্যালোচনা করবে, প্রয়োজনে দায়িত্বশীলতার সাথে চ্যালেঞ্জ করবে এবং সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে গঠনমূলকভাবে শক্তিশালী করবে।
এমনই এক নতুন অঙ্গীকার নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই যা এ দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের অধিকার ও প্রত্যাশা। চলুন, একসাথেই আমরা প্রত্যাশিত এই যাত্রা শুরু করি।