ঢাকা: ব্যবসা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে তিন ন্যায়পাল নিয়োগ, কর বৈষম্য কমাতে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর-অবকাশ সুবিধা থেকে বেরিয়ে আসার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিকে ‘অত্যন্ত বৈষম্যমূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে এ চুক্তি থেকে সরে আসার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সিপিডি কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত: ১৮০ দিন এবং তারপর’ শীর্ষক মিডিয়া এক ব্রিফিংয়ে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমান সরকার গঠনের পরপরই বিভিন্ন খাতে বিশেষত অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতে সরকারের প্রধান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তাদের আগামী দিনের করণীয় ঘোষণা করছেন। এসব করণীয়র মধ্যে নিজেদের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারকে সামনে রেখে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে। সেটা বিবেচনায় নিয়ে এ মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আয়োজন করেছে সিপিডি।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই সময়ে রাজস্ব আহরণ সবচেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এশিয়ার মধ্যে আমাদের রাজস্ব জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে কম এই মুহূর্তে। বর্তমান বিএনপি সরকার রাজস্বের টার্গেটে ৪ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে চায়, এটা আমাদের বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ এর লক্ষ্যমাত্রা ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের পরিকল্পনায় সম্পদ কর যুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে। এক্ষেত্রে কর ন্যায্যতা যেন মাথায় রাখেন সেটা আমরা বলতে চাই।
তিনি বলেন, ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় আমাদের প্রস্তাব থাকবে- কর বৈষম্য কমাতে এনবিআর-এর উচিত হবে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা। যারা নিয়মিত কর অব্যাহতি, কর ফাঁকি, কর ছাড়, কর আহরণ ইত্যাদি বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে। অন্যদিকে ভ্যাট রেটের ক্ষেত্রে ৮টি স্তর রয়েছে, সেটাকে কমিয়ে ধীরে ধীরে ৩ স্তরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে ভ্যাট হার ২ স্তরে এবং পরবর্তী সময়ে সিঙ্গেল হারে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিতে হবে।
রাজস্ব আয় বাড়াতে কর অবকাশ সুবিধা থেকে সরে আসার ওপর গুরুত্বারো করে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, এনবিআর অনেক ক্ষেত্রে কর অবকাশ সুবিধা দিয়ে থাকে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। যেমন অনেক এন্টারটেইনমেন্ট ক্লাব কিংবা স্টক মার্কেটে কর অবকাশ রয়েছে। এসব জায়গাগুলোকে বিবেচনা করতে পারে। এছাড়া খাতভিত্তিক কর অবকাশ কিংবা জ্বালানিভিত্তিক কর অবকাশ রয়েছে, সেগুলো তুলে দিয়ে সামগ্রিকভাবে একক নীতিকে ওই সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। যাতে সব খাতে সমহারে এমন সুবিধা পেতে পারে। এছাড়া শুধু ব্যক্তি শ্রেণির জন্য নয়, সব ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে অনলাইন কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা উচিত।
তিনি বলেন, ছোট উদ্যোক্তার জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে আন্তর্জাতিক ট্যাক্স ফাঁকি রোধে যে গাইডলাইন রয়েছে সে বিষয়ে চুক্তি করা দরকার। এনবিআরের ভেতরে একজন স্বাধীন পরিচালক রাখা প্রয়োজন। এনবিআর-কে ভাগ করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে যে দুটি ভাগ হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে সেগুলোর যেন বাস্তবায়ন হওয়াটাও জরুরি।
ব্যবসা পরিবেশ সম্পর্কে মূল প্রবন্ধে ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রাতিষ্ঠানিক লেনদেন করতে হয়। এজন্য দুর্নীতি ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও বটে। দুর্নীতি রোধে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবসাজনিত ন্যায়পাল, ব্যাংক ন্যায়পাল ও কর ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া উচিত।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। গভর্নর নিয়োগের প্রক্রিয়া আরও শক্ত, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ, স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বাছাই পদ্ধতি চালুর সুপারিশ করে তিনি বলেন, এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জনআস্থা দুই-ই বাড়বে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের পুঁজিবাজারকে কার্যকর ও আস্থাশীল রাখতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতে আরও কঠোর তদারকি প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার আগে বাজার ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি।