Tuesday 03 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভুয়া ডকুমেন্টে ইসলামি ব্যাংক ও ২ গ্রাহক কোম্পানির ইডিএফ’র অর্থ আত্মসাৎ

আদিল খান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৩ | আপডেট: ৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৫
ঢাকা: রিজার্ভের অর্থে গঠিত রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) ঋণ নিয়ে নানা লুকোচুরি চলছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে বিশেষ যোগসাজশে ইডিএফের অর্থ অপব্যবহারের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এমন কী গত ৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরও ব্যাংকের লুটেরাচক্র আমদানি না করেও ভুয়া মাস্টার এলসি রিপোর্ট করে তার বিপরীতে পণ্য আমদানির নামে ইডিএফের অর্থ কারসাজি অব্যাহত রেখেছে ইসলামী ব্যাংক পিএলসির গ্রাহক ইউনিফিল কম্পোজিট ডাইং ও ট্রু ফেব্রিকস লি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিদর্শনে এই অভিনব জালিয়াতির তথ্য উঠে এলে ইসলামী ব্যাংকে জরিমানা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকটি জরিমানা পরিশোধ করলেও ঐ গ্রাহকদের একই পদ্ধতির জালিয়াতি অব্যাহত রয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইডিএফ সংশ্লিষ্ট শাখা হতে তাদেরকে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ এপ্রিল ট্রু ফেব্রিক্স লি. এর মাত্র এক ডলার মূল্যমান সেলস কন্ট্রাক্টের বিপরীতে ৭২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬২ ডলারের ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা হয়। তার বিপরীতে ৭১ লাখ ৯৭ হাজার ৪৩৪ ডলারের ইডিএফ ঋণ ছাড় করা হয়। অথচ এটি বিদেশি এলসি ছিল না। ক্রেতা ছিল দেশীয় ইউনিফিল গ্রুপের সিস্টার কনসার্ন আরমান গ্রাফিকস অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেড। এটি ভুয়া এলসি হওয়ায় কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। আবার ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বরের মাস্টার এলসির মূল্য ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেখানো হয়। সেখানে ব্যাক টু ব্যাক এলসি দেখানো হয় ৪৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৫ মূল্যের ইডিএফ। এটির ক্রেতা ছিল নিপ্পন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কোন পণ্য রপ্তানি হয়নি। এই জালিয়াতিতে সহায়তা করে ইসলামী ব্যাংক। অনলাইন ফরেন এক্সচেঞ্জ মনিটরিং সিস্টেম থেকে পুরো বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে স্পষ্ট থাকে। সম্পূর্ণ বিষয় জেনেও ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ এন্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে তাদেরকে অর্থায়ন করা হয়েছে।
ইউনিফিল কম্পোজিট ডাইং ও ট্রু ফেব্রিকস লি. সরকারের পালা বদলের পরও পূর্বের সরকারের স্টাইলে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৭৪৫ ডলারের মাস্টার এলসি দেখায়, যার বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলার রেকর্ড ৫০ লাখ ৪০ হাজার ৬৭ ডলার। এর বিপরীতে ইডিএফের ঋণ গ্রহণ হয়েছে ৪৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৫ ডলার। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বিদেশি এলসি নয় হিসাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর ক্রেতা বাংলাদেশে অবস্থিত নিপ্পন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এর বিপরীতে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। আর মাস্টার এলসির বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ব্যাকটু ব্যাক এলসি করা যায়। অথচ সেখানে মনগড়া হিসাবে মাত্রাতিরিক্ত এলসি দেখানো হয়েছে। পরিদর্শনে অনিয়ম প্রমাণিত হলে জরিমানা আদায় করা হয়েছে বটে কিন্তু একই পদ্ধতির জালিয়াতি অব্যাহত রয়েছে এবং অনিয়ম জেনে-বুঝেও তাদেরকে অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই তহবিল রপ্তানিকারকদের জন্য লাইফলাইন হওয়ার কথা ছিল। অথচ ব্যাংকগুলো এটাকে নিজেদের সুবিধার খাতায় ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মনিটরিং না থাকলে এভাবে সরকারি প্রণোদনা কাজে লাগবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ এন্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট পরিচালক এ কে এম কামরুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তো ইসলামী ব্যাংকের এলসির হিসাবের বিপরীতে ইডিএফের ঋণ ছাড় করেছে। যা ব্যাংকিং সিস্টেম মেনেই করা হয়। তবে জালিয়াতি করলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন করে অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় জরিমানা করেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫টি এলসির (নং ০৮৭২২৪০৫০২৫৪,  ০৮৭২২৪০৫০২৬০, ০৮৭২২৪০৫০২৬১, ০৮৭২২৪০৫০২৬২ ও ০৮৭২২৪০৫০২৫৪) মাধ্যমে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫০ ডলার ইডিএফের অর্থ ছাড় হয়। যার কোন মাস্টার এলসি নেই। আবার ইউনিফিল কম্পোজিট ডাইং ও ট্রু ফেব্রিক্স লি চুক্তির বিপরীতে ৯১ লাখ ৮৭ হাজার ৫১৭ মার্কিন ডলার ইডিএফ গ্রহণ করেছে। সেখানে ১ কোটি ২০ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪২ ডলার মূল্যের দেখানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে চুক্তি অধীন এলসি নম্বরের বিপরীতে কোন রপ্তানির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া চুক্তির কোন তথ্য রিপোর্ট করেনি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। আর রিপোর্ট ব্যতীত ব্যাক টু ব্যাক এলসি এলসি করা যায় না। এখানে স্পষ্ট প্রমাণ হয়েছে যে, ইসলামী ব্যাংকের যোগসাজসে ভূয়া চুক্তির বিপরীতে ইডিএফ গ্রহণ করেছে প্রতিষ্ঠান দুটো। মানি লন্ডারিংয়ের ব্যাপক সংশয় দেখা গেছে। যা বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘন।
এদিকে, একাধিক ব্যাংকের ইডিএফ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ নাম প্রকাশ না করার শর্থে জানান, ইডিএফের অর্থ হরিলুটে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তাদের যোগসাজর রয়েছে। তারা ব্যাংক থেকে তথ্য নিয়ে কমপ্লায়েন্স মেনে চলে এমন প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে থাকেন। কখনো কখনো শর্ত পুরণ করার পর লোক দেখানো ভিজিট করেন। আর উপর মহলের কর্মকর্তারা অধীনন্ত ছা-পোষা গোছের কর্মকর্তাদের দিয়ে ইন্সপেকশন করান। তাদের বিমানে ট্যুর ও বিলাসী হোটেলে থাকার সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিপরীতে, বহু সংখ্যক ভূয়া গ্রাহক রয়েছে, যারা ইডিএফ খাতে কোটি কোটি ডলার ভুয়া অর্থায়ন গ্রহণ করেছে। এদের অনিয়মের ব্যাপারে তারা পুরোপুরি ওয়াকিবহাল, এমনকি নিজেরাই জড়িত থাকেন।
জালিয়াতির মাধ্যমে ভূয়া এলসির বিপরীতে ইডিএফের অর্থ ছাড় বিষয়ে জানতে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খান বলেন, এ বিষয়ে পরে কথা হবে। তার কথামত পরে কল দিলে তার ব্যক্তিগত সহকারী কল রিসিভ করে মিটিংয়ের কথা বলে লাইন কেটে দেন। পরে মেসেজ পাঠালে তিনি জবাব দেননি। সশরীরে ব্যাংকর প্রধান কার্যালেয় অবস্থিত জনসংযোগ বিভাগে জানতে চাইলে বিভাগের প্রদান কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা এলসি জালিয়াতি ও ৩ লাখ টাকা জরিমানার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকের বোর্ডের অনুমতি ছাড়া এসব জালিয়াতি আগেও হয়নি, এখনো হয়নি। আগে এসব পরিদর্শন হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু করত না। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক, গ্রাহকের সম্মতিতে ইডিএফের অর্থ ছাড় হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যোগসাজসে ইডিএফের অর্থ তছরুপ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন রিজার্ভ এন্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বরত নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল গঠিত। যদিও প্রকৃত সুবিধাভোগিরা না পান তাহলে তহবিলের লক্ষ্যই ব্যর্থ হবে। ইডিএফের অর্থ ব্যবহার নিয়ে পরিদর্শন করা হয়। সেখানে যোগসাজসের সুযোগ নেই। তবে ব্যাংক যদি এলসির সঠিক তথ্য না দিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নেয় তবে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর