ঢাকা: দেশের বাজারে সিগারেটের প্যাকেটে মুদ্রিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সিগারেট। এর ফলে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধু চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই সিগারেটের মুদ্রিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির কারণে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি কার্যালয়ে আয়োজিত ‘তামাক কোম্পানির মূল্য কারসাজি ও কর ফাঁকি রোধে করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। তামাক কোম্পানিগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং এর রাজস্ব প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিইআর ও বিএনটিটিপি যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করেছে।
গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটের পর সিগারেটের বাজারমূল্যে কী প্রভাব পড়েছে তা নিরূপণ করা। পাশাপাশি বাজারে তামাক কোম্পানির প্রভাব, ঘোষিত বিক্রয়মূল্য ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের ফারাক এবং এর ফলে কর ফাঁকির পরিমাণ নির্ধারণ করা।
পরিমাণগত পদ্ধতিতে পরিচালিত এই গবেষণায় দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগ নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি বিভাগ থেকে বিভাগীয় শহরসহ আরও দুটি জেলা শহর দৈবচয়নের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়।
মোট ১২টি শহরের ৪৮টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব দোকান থেকে সিগারেট প্যাকেটে মুদ্রিত মূল্য, বিক্রেতার ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্য, খুচরা শলাকা বিক্রির দাম এবং দৈনিক বিক্রির পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে মোট ২০টি ব্র্যান্ডের সিগারেট পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রিমিয়াম স্তরের ২টি,উচ্চ স্তরের ২টি,মধ্যম স্তরের ৭টি,নিম্ন স্তরের ৯টি ব্র্যান্ড রয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রায় সব ব্র্যান্ডের সিগারেটই প্যাকেটে লেখা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেতারা প্রতি প্যাকেট সিগারেটের জন্য গড়ে ১৪ থেকে ৪০ টাকা বেশি পরিশোধ করছেন, যা নির্ধারিত মূল্যের প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি।
বিশেষ করে মধ্যম স্তরের ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে মূল্য ব্যবধান সবচেয়ে বেশি, যা কিছু ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
প্রিমিয়াম স্তরের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড বেনসন ও মার্লবোরো প্যাকেটের এমআরপির তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ২৮ টাকা ও ২৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটে যেখানে প্রতিটি শলাকার দাম ১৮.৫ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে বাজারে সেটি প্রায় ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতা সিগারেট প্যাকেটের এমআরপি সমান বা তার চেয়েও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে প্যাকেটে লেখা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
গবেষকদের মতে, খুচরা বিক্রেতারা স্বাধীনভাবে মূল্য নির্ধারণ করতে পারেন না; বরং কোম্পানি বা ডিলারদের নির্ধারিত দামের ভিত্তিতেই বিক্রি করতে হয়। এতে খুচরা বিক্রেতার লাভের বড় অংশও কোম্পানির কাছে চলে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এমআরপির চেয়ে বেশি দামে বিক্রির কারণে গত চার অর্থবছরে সিগারেট খাতে মোট রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সৈয়দ মাহাবুল আলম বলেন, সিগারেট কোম্পানিগুলো সুকৌশলে দাম বাড়ায়। অনেক কোম্পানির লাইসেন্স নেই। কিন্ত সরকারি সংস্থাগুলো এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কর ফাঁকির সাথে কিছু সংস্থাও দায়ী।
বাজারে ১০ বা ১২ শলাকার প্যাকেটের সরবরাহ তুলনামূলক কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০ শলাকার প্যাকেট বিক্রি হলেও খুচরা শলাকা বিক্রি ব্যাপকভাবে চলছে। এতে সরকার কর হারাচ্ছে এবং নতুন ধূমপায়ীদেরও সহজে সিগারেট কেনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাজস্ব ক্ষতি কমাতে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—এমআরপিতে সিগারেট বিক্রি কঠোরভাবে নিশ্চিত করা,বাজার মনিটরিং ও কর আদায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা,খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করা,সিগারেটের বহু স্তরের মূল্য কাঠামো কমিয়ে আনা,অ্যাডভেলরেম কর পদ্ধতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা চালু করা,শক্তিশালী জাতীয় তামাক কর নীতি প্রণয়ন।
গবেষকদের মতে, এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে তামাক ব্যবহারও কমবে।