চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। এ সরকারের কার্যক্রমও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এদিকে মন্ত্রিসভা গঠনের পর সবার দৃষ্টি এখন সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের দিকে। নারী আসনগুলো নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে তোড়জোর।
সংরক্ষিত এসব আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নারী নেতারা। সবাই নিজের মত করে লবিংয়ে ব্যস্ত। তবে বিগত দিনগুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নারী রাজপথে ছিলেন তারাই সংরক্ষিত আসনের দাবিদার- এমনটিই দাবি করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের একাধিক নেতা।
আগের মতো এবারও এ জেলা থেকে একজন সংরক্ষিত নারী এমপি নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এই আসন নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা। এসব আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অন্তত সাত জন নারী নেত্রীর নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়া, তৃণমূলের আলোচনায়ও চলছে নানান হিসাব-নিকাশ।
দলীয় সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার পর থেকেই সরব হয়েছেন সম্ভাব্য নারী প্রার্থীরা। এরই মধ্যে কোনো কোনো প্রার্থী কেন্দ্রে জীবনবৃত্তান্তও জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় উপস্থিতি দেখাচ্ছেন, আবার কেউ সংগঠনের অতীত ভূমিকা তুলে ধরছেন বিভিন্ন মহলে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলের হাইকমান্ডের ওপর। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আলোচনায় যারা—
মাসউদা আফরোজ হক শুচি
এই নেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। তিনি জেলা মহিলাদলের সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির দুর্দিনে স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশে থাকায় তিনি জেলাব্যাপী পরিচিত মুখ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তার পক্ষে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সরব।
সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে শুচি বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমান আমাকে দায়িত্ব দিলে নারী ক্ষমতায়ন, আইনের শাসন ও স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। বিগত ২০১৮ সালের নির্বাচনে আমি এখানে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করায় নির্যাতিত হয়েছি, এমনকি সেসময়ের নির্যাতনে আমার স্বামী পুঙ্গ হয়েছেন। আমি শতভাগ আশাবাদী, দল আমার রাজনৈতিক জীবনের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’
সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির তালিকায় যে ক’জনের নাম আলোচনায় রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া। তিনি বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদের সহধর্মিনী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক এই নেতা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। তৃণমূলেও রয়েছে তার রাজনৈতিক কদর।
পাপিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘দল যাকে যোগ্য মনে করবে তিনিই মনোনয়ন পাবেন। তাছাড়া, আমি তো সাবেক সংসদ সদস্য। তাই নতুন করে আমার যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার মতো আর কিছুই তো অবশিষ্ট নেই।’
নাদিরা চৌধুরী
চাঁপাইবনাবগঞ্জ জেলা মহিলাদলের সহ-সভাপতি নাদিরা চৌধুরী। তিনিও সংরক্ষিত নারী আসনের অন্যতম একজন দাবিদার। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘নানান সংগ্রাম ও আন্দোলনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। এই মুহূর্তে এ জেলার মানুষ আমাকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দেখতে চায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এমপি হলে সবাইকে নিয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করব।’
ফরিদা পারভিন মেঘলা
জেলা বিএনপির সদস্য। বিগত শিবগঞ্জ পৌর নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী প্রয়াত বিএনপি নেতা ওজিউল ইসলামের সহধর্মিনী এই মেঘলা। তিনিও সংরক্ষিত নারী আসনের দাবিদার হয়ে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পরও আমি হাল ছাড়িনি। জেলা বিএনপির একমাত্র মহিলা সদস্য হিসেবে আমি সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছি।’ মেঘলা বলেন, ‘দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, নির্ভীক নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে আমি এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন ও দলের মর্যাদাকে আরও শক্তিশালী করতে চাই।’
সায়েমা খাতুন
শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের দুইবারের ভাইস চেয়ারম্যান তিনি। একইসাথে শিবগঞ্জ উপজেলা মহিলাদলের সভাপতি পদে রয়েছেন। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দলমত নির্বিশেষে সকলের জন্য কাজ করব।’ এছাড়াও নারী ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ কাজের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সায়েমা।
শাহানাজ খাতুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলাদলের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শাহানাজ খাতুন। সেইসঙ্গে তিনি ভোলাহাট উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান। শাহানাজ বলেন, ‘অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি, একাধিকবার কারাবরণ করেছি। আশা করছি, দল আমার এই ত্যাগ ও অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করবে।’
এ ছাড়াও, জেলা বিএনপির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জেলা মহিলাদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি দিলসাদ তাহমিনা বেগম মিমিও মনোনয়ন প্রত্যাশী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় ত্যাগ, সাংগঠনিক ভূমিকা, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ- সবমিলিয়ে তাদের প্রত্যেককে ঘিরেই আলাদা-আলাদা সমীকরণ তৈরি হয়েছে। তবে, তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিগত ১৭ বছরে যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, সাংগঠনিক ত্যাগ স্বীকার করেছেন শেষ পর্যন্ত দল তাদের মূল্যায়ন করবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ায় সংরক্ষিতের ক্ষেত্রে বেশি আসন পাবে বিএনপি, দ্বিতীয় জামায়াত ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।