শেয়াল আর কাঁকড়ার গল্প মোটামুটি অনেকেরই জানা। ইরান যুদ্ধে এই পুরনো গল্পটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। শেয়াল তো জিনগতভাবেই বেশ চালাক প্রাণী। সে এক কাঁকড়াকে ধরতে তাদের গর্তে লেজ ঢুকিয়ে দেয়। শেয়ালটি ভেবেছিল কাঁকড়া কামড় দিয়ে ধরলে সে টেনে তুলে কাঁকড়াকে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু সব কাঁকড়া তো একরকম নয়। তাদের মধ্যেও শেয়ানা আছে। সেরকম এক কাঁকড়ার গর্তে লেজ ঢুকানোর পর শেয়াল আর লেজ বের করতে পারে না। কারণ, কাঁকড়া তার লেজটি বেশ শক্ত করে ধরে ফেলে। কোনোরকমেই যখন লেজ বের করতে পারছিল না, তখন গর্তে অর্ধেক লেজ রেখেই তাকে মুক্তি পেতে হয়েছে। ইরান যুদ্ধ যেদিকে গড়াচ্ছে তাতে আমেরিকার অবস্থা কি সেই শেয়ালের মতো হতে যাচ্ছে?
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যেকোনো সময় হামলা চালাতে পারে এই আশঙ্কা বরাবরই ছিল। বছরের পর বছর অব্যাহত অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই নাজুক। তার ওপর আছে সামরিক বাজেট। ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মান সাম্প্রতিক সময়ে একেবারে তলানিতে চলে যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। একদিকে অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে কর্তৃত্ববাদী শাসন। দেশটির জনগণ কী পরিমাণে ক্ষুব্ধ, সামান্য একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ থেকে তা বোঝা যায়। ১৯৮৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর ৪৭ বছরে ইরানী কর্তৃপক্ষ বহুবার গণবিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছে, তবে এবারের বিক্ষোভ ছিল সর্বাত্মক ও ব্যাপক। এই বিক্ষোভে বাইরের কোনো ইন্দন ছিল কি না এই প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু এই বিক্ষোভ ছিল অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে মুক্তির জন্য গণবিক্ষোভ।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল ওই বিক্ষোভের তোপে দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, নানামুখী উসকানি সত্ত্বেও সে দেশের সাধারণ জনগণ সেভাবে মার্কিন ষড়যন্ত্রে কর্ণপাত করেনি। ইরানের শাসকরা বিক্ষোভ দমন করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র হতাশ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বল প্রয়োগে ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ করার প্রস্তুতি নিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরেকে তার বাসভবন থেকে দস্যুর মতো তুলে নেওয়ার ঘটনা বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখে মানুষের চোখ কপালে উঠেছে। হয়তো এই সক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অতি আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ভেনিজুয়েলার মতো ইরানের নেতৃত্বকে নাই করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে তারা।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কিছু নেতাকে অব্যাহত হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। এটাকে তারা যুদ্ধের বড় সাফল্য মনে করেছে। তাদের ধারণা, নেতৃত্ব শূন্য করা গেলে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ইরানের মতো সুরক্ষিত আকাশ প্রতিরক্ষার দেশে শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে লক্ষ্যে পরিণত করা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
নেতৃত্ব হারানোর পরও ইরান যে এইভাবে ঘুরে দাঁড়াবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। ইসরাইল ও প্রতিবেশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে শতশত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও হাজার হাজার ড্রোন আছড়ে পড়েছে। যদিও অনেকগুলো ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে ধ্বংস করে দিয়েছে, তারপরও হামলার ক্ষয়-ক্ষতি কোনোভাবেই কম নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইরানে হামলার ভয়ে মার্কিন সেনারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। সেনারা বিভিন্ন বেসরকারি বাসাবাড়ি হোটেল রেস্টুরেন্টে গোপনে অবস্থান করছে। আর ইরান সেখানে হামলা করছে। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে মার্কিন সৈনিকরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল। এই হামলা থেকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বেসামরিক এলাকা, তেল শোধনাগার, পানি শোধনাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। হামলায় এই পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছে, এর মধ্যে একটি স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬০ শিশু নিহত হয়েছে।
ঝুঁকিতে আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্ররা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্র দেশ বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, সৌদি আরব, জর্ডানে একযোগে যে ইরান হামলা করবে তা দেশগুলো ভাবতেও পারেনি।এতগুলো দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল হামলার ঘটনা নজিরবিহীন। মধ্যপ্রাচ্যের উল্লিখিত দেশগুলোতে কমপক্ষে ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঘাঁটি রয়েছে। সেখানে রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সেনা। এর মধ্যে আটটি ঘাঁটি হচ্ছে স্থায়ী ঘাঁটি। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, সৌদি আরব, জর্ডান এবং তুরঙ্কে ‘ইনজিরলিক ঘাঁটি’ রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বলেছে, তারা এখন পর্যন্ত ইরানের ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দু’টি ক্রুজ মিসাইল এবং ৫৪১টি ড্রোন মোকাবিলা করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরব ইরানের হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। ইরানের বিপ্লবীরক্ষী বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও কাতারে স্থাপিত মার্কিন রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্য করে তারা হামলা করেছে। এর মধ্যে আমিরাত ও জর্ডানে মার্কিন থাড ব্যবস্থা এবং কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের ডেজার্ট আই নামে পরিচিত এফপিএস ১৩২ রাডার ধ্বংসের দাবি করেছে আইআরজিসি। এফপিএস-১৩২ রাডারটি দূরপাল্লার আর্লি ওয়ার্নিং ও মহাকাশ নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হয়।
ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছে, তাদের লক্ষ্য প্রতিবেশি দেশগুলো নয়, বরং সেইসব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি এই ঘটনায় মার্কিন সক্ষমতার জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করে। অন্যদিকে মার্কিন সহায়তায় দেশগুলো যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে চেয়েছে এক ইরানের মিসাইল ঝড়ে তা এলোমেলো হয়ে গেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর নিরাপত্তার বিষয় দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। ইরান এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হলেও এই ঘটনা পারস্য দেশগুলোর জন্য অনেক দিন সুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে।
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে হামলা অব্যাহত
ইরানের ড্রোনের সক্ষমতা এরই মধ্যে সারা দুনিয়ায় সুনাম কুড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ইরানের তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছে। ইরানি ড্রোনের রাশিয়ান ভার্সন তৈরি করেছে রাশিয়া। এই ড্রোনের তাণ্ডব আবার দেখা গেছে। ফতেয় ভেরিয়েন্ট জুলফিকার, কিয়াম-১,শাহাব ১/২ (স্বল্পমাত্রার), শাহাব -৩, ইমাদ, গদর-১, খোররামশহর, সেজ্জিল (মাঝারি পাল্লার) এবং সুমার, ইয়া-আলি, কুদস, পাভেহ এবং রাদ ( ক্রুজ মিসাইল) অস্ত্রের নাম এখন মুখে মুখে। তবে এইসব মারাত্মক অস্ত্রের বাইরেও যুদ্ধে ইরানের হাতে বড় অস্ত্র হচ্ছে হরমুজ প্রণালী।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে এক পঞ্চমাংশ তেল পরিবহণ হয়ে থাকে। যুদ্ধে এই প্রণালী ইরানের জন্য বড় হাতিয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রতিশোধ নিতে এই প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ বন্ধ করে দেওয়া হলে দুনিয়াব্যাপী এমনিতেই অস্থিরতা তৈরি হবে। এবং হয়েছেও তাই। ইরানের ওপর হামলার পর এই প্রণালীর ওপর পরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ২০টি জাহাজ হামলার শিকার হয়। সর্বশেষ ছয়টি জাহাজে হামলা করে আইআরজিসি। তারা হুঁশিয়ারি করে বলেছে যে, ইরানের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের জন্য ‘এক লিটার তেলও’ রাফতানি করতে দেওয়া হবে না।
তেলের বাজারে অস্থিরতা চলছেই
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগর ও সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নৌযান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। এতে তেলের বাজরে অস্থিরতা দেখা দেয়। শুরুতেই তেলের দাম ১২০ ডলারে উঠে যায়, যা ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর সর্বোচ্চ পর্যায়। বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহের দিক থেকে হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই রুট দিয়ে এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়ে থাকে। এই পথে সরবরাহ বিঘ্ন হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কেননা এই রুট দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে সিংহভাগ জ্বালানি সরবরাহ হয়ে থাকে। জ্বালানি তেলের দামের কারণে এরই মধ্যে আমাদের দেশে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্য এই পরিস্থিতি একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশে মূল্যস্ফীতি এমনিতে চড়া। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পারদকে বাড়িয়ে তুলবে। যদিও এখন পর্যন্ত জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই অবস্থা চলতে থাকলে দীর্ঘ ১৭ বছরের ভঙ্গুর অর্থনীতি কতটা চাপ নিতে পারবে সেটা দেখার বিষয়।
‘শিগগির যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে’, ট্রাম্পের এমন ঘোষণা এবং ৩২ সদস্যদেশের সমন্বয়ে গঠিত জ্বালানি নিরাপত্তা সমন্বয়কারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি( আইইএ) এর পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণায় মাঝখানে তেলের দাম কমলেও আবার বেড়েছে। ইরান আবারও বলেছে, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বা তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কৃত যে কারও জাহাজে হামলা হতে পারে। এ ছাড়া, তেলের দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও দেশটি সতর্ক করে দিয়েছে। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ব বাজারে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
ইরানের মিত্ররা সক্রিয় কতটুকু
যে মুসলিম বিশ্ব যুদ্ধবাজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মোকবিলায় একাট্টা হয়ে ইরানের পক্ষে দাঁড়াতে পারতো সেই মুসলিম বিশ্ব বহু ধারায় বিভক্ত। কেবল বিভক্তই নয়, শিয়া-সুন্নি বিরোধসহ নানা সমীকরণে তারা ইরানের বিরুদ্ধ শিবিরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে সিরিয়া বাদে পারস্য উপসাগরের দেশগুলো সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত। যে কারণে ইরানে হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেশে দেশে মুসলমানদের যে বিক্ষোভ প্রতিবাদে ফেটে পড়ার কথা তা দেখা যাচ্ছে না। এই কথা আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ দেশের ইসলামী দলগুলো ভারতের আধিপত্যের বিষয়ে যতটা সরব ইরানে মার্কিন হামলার বিষয়ে সে তুলনায় অনেকটাই নীরব।
ইরানের পরীক্ষিত মিত্র হিসেবে পরিচিত লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ফিলিস্তিনের হামাস যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর হামলার বিষয়ে সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া ইরানের বন্ধু হিসেবে পরিচিত হলেও এই যুদ্ধে সরাসরি কতটুকু সহায়তা করছে, তা নিশ্চিত নয়। তবে এই দুই দেশ নানা কারণে সরাসরি সহায়তা কিংবা যুদ্ধে না জড়ালেও তাদের অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর চাপ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া, অনেকে ধারণা করছে, রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও ইরানকে প্রযুক্তি ও তথ্যগত সহায়তা দিয়ে বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানোর কৃতজ্ঞতা যেমন প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর একধরনের প্রতিশোধ নিচ্ছে। রাশিয়ার সহয়োগিতার কারণে ইরানের পক্ষে মার্কিন লক্ষ্য বস্তুতে নিখুঁত হামলা করা সম্ভব হচ্ছে ইরানের।
ইউক্রেন যুদ্ধে ইরানের ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে শক্তি যুগিয়েছে, যা রাশিয়া ভুলে যায়নি। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধিও রাশিয়ার জন্য ইতিবাচক হয়ে উঠেছে। পশ্চিমাদের চাপের কারেণ কম দামে তেল বিক্রিতে বাধ্য হলেও এখন চড়া দামে তেল বিক্রি করে রাশিয়া তা পুষিয়ে নিচ্ছে। এদিকে তেলের দাম যেভাবে চড়া হয়েছে, তা দীর্ঘদিন বজায় থাকলে রাশিয়ান তেলের ওপর নির্ভরশীল পশ্চিামা দেশেগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাবে। যে ইরানকে এখন এক অর্থে বন্ধুহীন মনে করা হচ্ছে, সেই ইরান প্রকৃত অর্থে বন্ধুহীন থাকবে না যুদ্ধ বেশ কিছু দিন গড়ালে।
যুদ্ধ কতদিন চলবে
ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধ কতদিন চালাবে কিংবা কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ করবে- এই প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র যতটা সহজে ইরানকে কাবু করতে পারবে ভেবেছিল, যুদ্ধে জড়িয়ে বুঝতে পারছে বিষয়টি অত সহজ নয়। ট্রাম্প প্রশাসন যে অনেকটাই বেকায়দায় আছে তাদের একেক সময় একেক রকম বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণান্ত্রের মজুদও কমে আসছে কি না, নানা অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরানের পক্ষে চাইলেও দীর্ঘদিন যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব হবে কি না, নতুন করে অস্ত্র তৈরি করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কথটা সম্ভব তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তারপরেও ইরান সহজে হাল ছাড়বে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, ইরান এখন আর যুদ্ধ বিরতিতে যেতে চাচ্ছে না, যা অনেকের কাছেই বিস্ময় বলে মনে হচ্ছে।
একই অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে যেভাবে অস্থির করে তুলেছে এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো যেভাবে তছনছ করে চলেছে তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বেকায়দায় আছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার হরমুজ প্রণালী দখলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েও পারেনি। এতে তার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
এর বাইরে চীন রাশিয়ার কৌশলগত চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে- তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ করে সেটা এখন দেখার বিষয়। নাকি শেষ পর্যন্ত শেয়ালের মতো অর্ধেক লেজ গর্তে রেখেই যুদ্ধ শেষ করতে হবে- তা সময় বলে দিবে।