সিরাজগঞ্জ: খাল-বিল, নদ-নদীর দেশ বাংলাদেশ। নদীপ্রধান বাংলাদেশের অন্যতম একটি জেলা সিরাজগঞ্জ। এই সিরাজগঞ্জের ভেতর দিয়ে চলে গেছে বাংলাদেশের দীর্ঘতম নদীর একটি ‘যমুনা’। সেইসঙ্গে এই জেলার ভেতর দিয়ে নানান জায়গায় প্রবাহিত হয়ে আছে খাল-বিল-নদী-নালা। যমুনাসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদী একসময় ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু দীর্ঘদিনের খরা ও নাব্যতা সংকটসহ নদী ভরাট এবং শাখা নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে হারিয়েছে এগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে এককালের ‘প্রবাদ নদী ভরা মাছ’র ঐহিত্য হারিয়ে যেতে বসেছে। আবার পানি কম থাকায় শীত মৌসুমে নৌকা চলাচলও বন্ধ থাকছে। এতে নদীনির্ভর এই সিরাজগঞ্জের মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।
নদ-নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় শুধু জেলে বা নৌ-শ্রমিকরাই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিই ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছে, জীবিকাহীনদের শুধুমাত্র ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী খনন ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী স্থায়ীভাবে জীবিকা হারাবে। এ কারণে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন ও খাল পুনঃখনন মত দেন তারা।
সরেজমিনে জানা যায়, যমুনার বুক জুড়ে জেগে ওঠা হাজার হাজার একর জমিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছেন। উৎপাদন বাড়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও চরম বিপাকে পড়েছেন নৌ-শ্রমিক ও জেলেরা। একসময় ভরা নদীতে নৌকা চালিয়ে ও মাছ ধরে যারা সংসার চালাতেন, তারা এখন কাজ হারিয়ে দিশেহারা। নদীতে পানি না থাকায় অনেকেই তাদের শেষ সম্বল নৌকা ও জাল বিক্রি করে দিয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকেই কাজের সন্ধানে শহরসহ ঢাকামুখী হয়েছেন। শহর ও ঢাকায় গিয়ে কেউ রিকশা-ভ্যান, কেউ সিএনজি, গার্মেন্টস, ট্রাক-বাসের হেলপার, আবার কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় যমুনা, ইছামতি, হুরাসাগর, বাঙালি, বড়াল, করতোয়া, ফুলজোরসহ প্রায় ১৩টি উল্লেখযোগ্য নদী রয়েছে। এসব নদীর বেশিরভাগই যমুনা নদীর শাখা বা উপনদী হিসেবে পরিচিত। জেলায় স্থায়ী মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৮৭৩ জন। এ ছাড়া, মৌসুমি মৎস্যজীবী রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালি ও শাহজাদপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী এবং তাড়াশ ও উল্লাপাড়ার চলনবিলে একসময় সারা বছর পানি থাকলেও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পলি জমে বর্তমানে অনেক নদী ও খালের বিভিন্ন অংশে চর জেগে উঠেছে। কোথাও কোথাও নদ-নদী, খাল-বিল প্রায় শুকিয়ে গেছে। এ কারণে অনেক স্থানে কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করছে।

মাছ নেই, চলে না নৌকা- দিশেহারা যমুনা পাড়ের শ্রমজীবীরা। ছবি: সারাবাংলা
কাজিপুরের নাটুয়ারপাড়া চরের জেলে নিমাই দাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে প্রতিদিন নদীতে নামলে ভালো মাছ পাওয়া যেত। এখন সারাদিন জাল ফেলেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। নদীতে অনেক চর জেগে উঠেছে। ফলে পানিও নেই কোথাও কোথাও। আবার যেসব জায়গায় কিছুটা পানি আছে সেখানেও মাছের দেখা মিলছে না। এ কারণে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’
আরেক জেলে রহিম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘নদীতে পানি কমে গেছে, খালগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। মাছ না থাকায় অনেকেই এই পেশা বদল করে অন্য জেলায় চলে গেছেন।’ সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চরের জেলে মালেক শেখ সারাবাংলাকে বলেন, ‘নদীতে চর পড়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। নদীতে মাছের দেখা না পেয়ে অনেক জেলে শহর ও ঢাকায় গিয়ে অন্য কাজ করে কোনো রকম সংসার চালিয়ে যাচ্ছে।’
এদিকে, নৌ-শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম দুর্দশার। নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে নৌপথে নৌকা চলাচল প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। ফলে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বহু মাঝি ও নৌ-শ্রমিক। শহরের মতি সাহেবের ঘাটের মাঝি রফিকুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘জেলার প্রধান নদী যমুনা ও তার শাখা নদীগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছি। দীর্ঘদিনের খরা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের অনেক জায়গায় চর পড়েছে। একারণে নদীপথে নৌকা চলাচল সীমিত হয়ে গেছে।’
স্থানীয় নৌ-শ্রমিক আব্দুল করিম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আগে নৌকায় চরের মানুষ ও মালামাল পরিবহণ করেই সংসার চলতো। এখন নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চালানোই যায় না। শুষ্ক মৌসুম আসার আগেই নদী শুকিয়ে যায়। কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
অপর দিকে চৌহালী উপজেলার অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এই উপজেলা থেকে অগণিত মানুষ জেলা শহরে যাতায়াত করে। এ ছাড়া, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন যমুনা হয়ে লেখাপড়া করতে যায়। কিন্তু জেগে ওঠা ডুবো চরের কারণে তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে তাদের কর্মঘণ্টাও।
এনায়েতপুর নৌকা ঘাটের ইজারাদার ইউসুফ আলী সারাবাংলাকে জানান, যেভাবে নদীর পানি কমছে, তাতে নৌকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন ড্রেজিং করে নৌপথ তৈরি করা না হলে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে জেলা সদরের সঙ্গে নৌপথের চৌহালীসহ বিভিন্ন স্থানের যাবতীয় কর্মকাণ্ড স্থরিব হয়ে পড়বে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্যজীবীদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভিজিএফ কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দ্রুত তাদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হবে।’
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘নদী খনন ও নাব্যতা সংকটের বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ-র আওতাধীন। এ ব্যাপারে কী করণীয় তারাই বলতে পারবে। আমরা শুধু ভাঙনের বিষয়টি দেখি।’
সিরাজগঞ্জ বিআইডব্লিউটি-এর যুগ্ম-পরিচালক ক্যাপ্টেন জি.এ.এম আলী রেজার কাছে এ বিষয়ে জানাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক স্থানে ড্রেজিংয়ের কাজ করা হয়েছে। নদীতে পানি বাড়লে জেলার অনেক জায়গায় খননের কাজ শুরু করা হবে।