শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে সিসা (লেড) তৈরির একটি কারখানা। পুরনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, যা আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্য, গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মহিষকান্দি গ্রামের একটি পরিত্যক্ত ইটভাটা ভাড়া নিয়ে প্রভাবশালী একটি মহল অবৈধভাবে সিসা গলানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কারখানাটির কোনো ধরনের পরিবেশগত অনুমোদন বা বৈধ কাগজপত্র নেই। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সহযোগিতায় অধিকাংশ সময় রাতের বেলায় ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা গলানো হয়। এ সময় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও তীব্র দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। এ ধরনের দূষণ মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মানসিক সমস্যা, রক্তশূন্যতা এবং মস্তিষ্কের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পুরনো ব্যাটারির বর্জ্য ও পচা সিসার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী। স্থানীয়দের দাবি, দূষণের কারণে ফসল ও গাছপালা নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, কয়েক মাস ধরে এলাকায় আগুনের কালো ধোঁয়া ও অসহনীয় দুর্গন্ধ দেখা যাচ্ছে। নিয়মিত অচেনা লোকজনের যাতায়াত এবং যানবাহনের আসা-যাওয়া লক্ষ্য করা যায়। গত তিন মাসে বিষাক্ত সিসার প্রভাবে অন্তত ১২ থেকে ১৫টি গবাদিপশুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। অনেক পরিবার পরিবেশ দূষণের কারণে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাসুম সরদার নামে এক ভুক্তভোগী তার মৃত গরু ভ্যানে করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মথুরাপুর ইউনিয়নের মহিষকান্দি চরপাড়াতলী সংলগ্ন এলাকায় স্থাপিত পুরনো ব্যাটারি কারখানা থেকে নির্গত দূষিত বায়ু আশপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে। গত ৩ থেকে ৪ মাসে এলাকায় গবাদিপশু ও পাখি অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহিম জানান, প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করেছিলেন তিনি। হঠাৎ করেই পুরো ফসল পচে নষ্ট হয়ে যায়। তার দাবি, অবৈধ ব্যাটারি কারখানার দূষণের কারণেই ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং এলাকার জমি ধীরে ধীরে চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।
৬৫ বছর বয়সী ভুক্তভোগী সেতারা বেগম বলেন, আমার দুটি গাভী প্রতিদিন প্রায় ৮ কেজি করে দুধ দিত। সম্প্রতি কারখানার দূষণের কারণে গাভী দুটি মারা গেছে। তিনি ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের বিচারের দাবি জানান।
পাশের সখিপুর এলাকার এক কৃষক জানান, বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের কারণে এখন তাদের এলাকাতেও দূষণের প্রভাব পড়ছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং গবাদিপশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তারা দ্রুত কারখানাটি উচ্ছেদের দাবি জানান।
এর আগে, গত ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে কারখানাটিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কে. এম. রাফসান রাব্বি। অভিযানে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এ সময় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ৬ জনকে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের একদিন পর থেকেই পুনরায় কারখানাটি চালু করা হয়েছে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘পুরনো ব্যাটারির এসিড ও সিসা থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদনের সময় তৈরি হওয়া বিষাক্ত ধোঁয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগীদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া এ ধরনের দূষণ পশুপাখি ও পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক রাসেল নোমান বলেন, গত ৪ মার্চ আমরা ওই কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে ৬ জনকে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড প্রদান করি এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করি। তবে পরবর্তীতে জানতে পারি, অভিযানের পরপরই অবৈধ কারখানাটি পুনরায় চালু করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, ‘অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা উৎপাদন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়। পরিবেশ অধিদফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’