প্রতিবছর ঈদ, পূজা ও নববর্ষের মতো উৎসবের সময় কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। এবছর ঈদের ছুটি পড়েছে টানা সাতদিন। এর দুদিন বিরতিতে আবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস ও পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে তিনদিন ছুটি থাকছে। সবমিলিয়ে লম্বা ছুটিতে আরও বেশি পর্যটকের প্রত্যাশা করছেন পর্যটন নগরী কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীরা। আর পর্যটকদের বরণে নানারকম প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তারা।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবারের ঈদের ছুটি ঘিরে দীর্ঘ অবকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। টানা ১১ দিনের অবকাশ পাওয়ায় ভ্রমণপিপাসু মানুষের বড় একটি অংশ কক্সবাজারমুখী হবে। তাদের ধারণা, ঈদের পুরো সময়জুড়ে ৭ থেকে ১০ লাখ, অনুকূল পরিস্থিতিতে ১১ লাখ পর্যন্ত পর্যটকের সমাগম ঘটতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইতোমধ্যে জেলার পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস ও রিসোর্টে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। অধিকাংশ স্থাপনাই নতুন করে রং করা হয়েছে, কক্ষ সংস্কার করা হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে সেবার মান। কর্মীদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে পর্যটকসেবায় আরও পেশাদার হতে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, তিন ও চার তারকা মানের হোটেলগুলোতে ইতোমধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। তার ভাষায়, ‘ঈদের পরদিন থেকে টানা এক সপ্তাহ প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ পর্যটক অবস্থান করবেন।’
হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘বেশিরভাগ হোটেলে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। যাতে পর্যটকদের কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়।’
হোটেল সূত্রগুলো বলছে, ঈদ পরবর্তী প্রথম তিন দিন ২২, ২৩ ও ২৪ মার্চ কক্সবাজারে আবাসিক কক্ষ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে তারকা মানের বেশিরভাগ হোটেলই ‘হাউজফুল’ এর পথে।

কক্সবাজারের জনপ্রিয় হোটেল সায়মান বিচ রিসোর্ট এর ফিন্যান্সিয়াল কন্ট্রোলার আসাদুজ্জামান নূর জানান, তাদের হোটেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। ‘ঈদের পর টানা সাত দিন হাউজফুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজান ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সময়টাতে পর্যটক কম ছিল। তবে এখন মানুষের আগ্রহ স্পষ্টভাবে বেড়েছে।’
অন্যদিকে হোটেল কক্স টুডে এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব জানান, তাদের দুই শতাধিক কক্ষের মধ্যে ঈদের প্রথম তিন দিনের জন্য প্রায় অর্ধেকই আগাম বুকিং হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘রমজানেই আমরা হোটেলকে নতুনভাবে সাজিয়েছি। যাতে পর্যটকরা উন্নত অভিজ্ঞতা পান।’
হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পিআরও সায়ীদ আলমগীর জানান, ১৯ মার্চ থেকেই পর্যটকের উপস্থিতি বাড়তে শুরু করছে। ২৩-২৪ মার্চ সৈকতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যেতে পারে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর ঈদুল ফিতরে প্রায় ৯ লাখ ৭০ হাজার পর্যটক কক্সবাজারে এসেছিলেন। এবার সেই সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়াতে পারে। এতে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৩টি খাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার লেনদেন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘শুধু ঈদের ছুটিতেই ৭-৮ লাখ পর্যটক আসতে পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে মাসের শেষ পর্যন্ত এই সংখ্যা আরও বাড়বে।’
এদিকে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনকে সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার অঞ্চলের মুখপাত্র পারভেজ আহমদ জানান, টহল টিম, মোবাইল টিম ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা কোনো ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে থাকবে। পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
তিনি বলেন, ঈদকে ঘিরে শুধু হোটেল নয়, সৈকতজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বিচ বাইক মালিক, ঘোড়াওয়ালা, ফটোগ্রাফার, শামুক-ঝিনুক ও বার্মিজ পণ্যের বিক্রেতারা নিজেদের ব্যবসা নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। দীর্ঘ সময়ের মন্দাভাব কাটিয়ে নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন তারা।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানজুড়ে পর্যটক কম থাকায় অনেকেই ছাড় দিয়ে ব্যবসা চালিয়েছেন। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে এখন আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সবকিছু মিলিয়ে, রমজানের শান্ত-নির্জন কক্সবাজার খুব শিগগিরই রূপ নেবে এক প্রাণবন্ত, উৎসবমুখর পর্যটন নগরীতে। নীল সমুদ্র, বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি আর উৎসবের আমেজে ভিন্ন এক ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশের অন্যতম এই পর্যটন কেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, ‘এবারের ঈদেই আবার কক্সবাজারে ফিরবে সেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য।’