ঢাকা: যান্ত্রিক শব্দের বদলে এখন পাখির কিচিরমিচির, আর অসহনীয় যানজটের বদলে খাঁ খাঁ করছে পিচঢালা রাজপথ। না, এটি কোনো কল্পনার শহর নয়; এটি ঈদের ছুটির ঢাকা। নাড়ির টানে অধিকাংশ মানুষ ঢাকা ছাড়লেও, যারা রয়ে গেছেন তাদের আনন্দ আজ বাধভাঙা। এক অন্যরকম প্রশান্তি আর স্বস্তিতে ঈদ উদযাপন করছেন নগরবাসী। তবে গণপরিবহন কম থাকায় ফাঁকা ঢাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।
নতুন পাঞ্জাবিতে রিকশাচালকের ঈদ আনন্দ

– ছবি : সারাবাংলা
ভোরবেলায় সেমাই খেয়ে নতুন পাঞ্জাবি পরে রাস্তায় নেমেছেন রিকশাচালক রহমত আলী। জীবনের অধিকাংশ সময় ঘাম ঝরিয়ে কাটলেও আজ তার চোখেমুখে হাসির ঝিলিক। তিনি বলেন, “সারা বছর তো কামলা দেই, আজ ঈদের দিন। সকালে গোসল করে নতুন পাঞ্জাবিটা পরলাম, নামাজ পরে সেমাই খেয়ে তারপর বের হয়েছে। রাস্তা ফাঁকা, আজ কাজ করতে কোনো কষ্ট হচ্ছে না জানিয়ে শরীয়তপুরের রহমত আলী বলেন, মানুষজন হাসিমুখে ঘুরতাছে, দেখতেই ভালোই লাগছে।
শিশুদের কলকাকলিতে মুখর রাজপথ

– ছবি : সারাবাংলা
ফাঁকা ঢাকার সবচেয়ে বেশি সুবিধা উপভোগ করছে শিশুরা। চিরচেনা ট্রাফিক সিগন্যালের ভয় নেই, নেই ধোঁয়া আর ধুলোবালি। অনেক বাবা-মাকে দেখা গেছে ছোট সন্তানদের নিয়ে রিকশায় বা মোটরসাইকেল করে বা গাড়িতে করে ঘুরতে বের হয়েছেন। ধানমন্ডি এলাকায় পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ হোসেন বলেন, ঢাকায় তো নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা পাওয়া যায় না। আজ শহরটা যেন আমাদের। মেয়েটাকে নিয়ে রাজপথে ঘুরছি, ও খুব খুশি। এই ফাঁকা ঢাকাটা যদি সারা বছর থাকতো!”
বন্ধু আর আড্ডায় তারুণ্যের উল্লাস
তরুণ প্রজন্মের জন্য ঈদ মানেই বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া। রাজধানীর হাতিরঝিল, টিএসসি আর সংসদ ভবন এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে কেউ রেস্টুরেন্টে যাচ্ছেন, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে মেতেছেন দীর্ঘদিনের জমানো গল্পে।
বন্ধুদের সাথে খেতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিয়া জানান,”অন্য সময় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতেই দুই ঘণ্টা লাগে। আজ মাত্র ১৫ মিনিটে চলে এলাম। বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া, এই ফাঁকা ঢাকা আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ ঈদ গিফট।”
ফাঁকা ঢাকার রাজপথে বাস বা বড় গণপরিবহনের দেখা মিলছে খুবই কম। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ব্যাটারিচালিত অটো-রিকশা আর বাহারি হুড তোলা রিকশা। বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা থাকলেও মানুষের চোখেমুখে বিরক্তির বদলে দেখা গেছে স্বস্তি।
শান্তিনগর মোড়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রিকশার অপেক্ষায় থাকা রফিক সাহেব বলেন, “বাস নেই তাতে কী? আজ তো রিকশায় ঘোরার দিন। ধোঁয়া আর বাসের হর্ন ছাড়া এমন শান্ত ঢাকা বছরে তো মাত্র দুই-তিন দিনই পাওয়া যায়। ভাড়ার একটু বেশি হলেও আজ রিকশায় চড়েই পরিবার নিয়ে ঘুরবো।”
স্বস্তির নগরী
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো এখন অনেকটাই শান্ত। শাহবাগ, ফার্মগেট কিংবা কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে নেই কোনো তীব্র হর্ন বা বিশৃঙ্খলা। নগরবাসীর মতে, এই কয়েকদিনের জন্য ঢাকা যেন তার হারানো যৌবন ফিরে পায়। প্রিয়জনদের নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানো আর যানজটমুক্ত রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর এই অভিজ্ঞতাই এখন ঢাকাবাসীর ঈদের প্রধান আকর্ষণ।
ঈদের এই আমেজ আরও দু-তিন দিন থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। যান্ত্রিকতা কাটিয়ে ওঠা এই ঢাকা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, শান্তি আর স্বস্তি থাকলে এই শহরটাও হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর জায়গা।