কুমিল্লা: বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি তেল সরবরাহ ব্যবস্থায়। এর ধারাবাহিকতায় সারাদেশের মতো কুমিল্লাতেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদামতো তেল না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন পরিবহন চালক ও সাধারণ ভোক্তারা।
কুমিল্লার বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, তেল নিতে এসে দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে যানবাহনের চালকদের। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় পরিমাণ জ্বালানি না পেয়ে অল্প নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।
কুমিল্লার এক পেট্রোল পাম্প কর্মচারী মাহাদি ইসলাম বলেন, ‘আমরা এমনিতেই তেল কম পাই। তার ওপর যানবাহনের মালিক ও চালকেরা চাহিদার চেয়ে বেশি তেল নিতে চান। ফলে সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে গিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’
জ্বালানি সংকটের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মোটরসাইকেল চালক শাহ ইমরান বলেন, ‘আগে যেখানে দুই থেকে তিন লিটার তেল নিতাম, এখন একটু বেশি নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ পরে এসে যদি তেল না পাই, সেই ভয় কাজ করে। তবে এখনো বেশি দামে তেল কিনতে হয়নি, কিন্তু চাহিদার তুলনায় কম পেয়েছি।’
একই চিত্র প্রাইভেট কার চালকদের মধ্যেও। ক্ষোভ প্রকাশ করে বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘ডিজেল আমদানি করতে হয়, তাই সংকট হতে পারে। কিন্তু অকটেন তো দেশে উৎপাদন হয়। তাহলে অকটেনের সংকট কেন হবে? আমার গাড়িতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লিটার অকটেন লাগে, কিন্তু পাম্পে এসে পাঁচ-ছয় লিটারের বেশি পাই না। বিষয়টা সত্যিই বোধগম্য নয়।’
পণ্যবাহী পরিবহনের চালকরাও পড়েছেন বিপাকে। ট্রাকচালক আলাউদ্দিন বলেন, ‘সারাদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় মালামাল নিয়ে চলতে হয়, তাই ডিজেলের চাহিদা বেশি। কিন্তু পাম্পে গিয়ে চাহিদামতো তেল পাই না। দিনে কয়েকবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, এতে সময় নষ্ট হয় অনেক।’
তবে এখনো পর্যন্ত কোথাও সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
কুমিল্লা জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও চান্দিনার পূর্বাশা ফিলিং স্টেশনের মালিক নাদেরুজ্জামান খন্দকার বলেন, ‘আমরা পদ্মা অয়েল থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করি। তারা আমাদের রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম তেল পাচ্ছি। তাই আমরাও সেই অনুযায়ী গ্রাহকদের মধ্যে তেল বিতরণ করছি। আমাদের জানা মতে, কুমিল্লার কোনো পাম্পই নির্ধারিত দামের বেশি নিচ্ছে না।’
এ বিষয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আমির হোসেন বলেন, ‘দেশে মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠান—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা জ্বালানি সরবরাহ করে। এর মধ্যে পদ্মা তুলনামূলক সরবরাহ ঠিক রাখলেও মেঘনা ও যমুনা নিয়মিত সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বাজারে এই সংকট তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, বৈশ্বিকভাবে ডিজেলের সংকট থাকলেও কুমিল্লায় ডিজেলের পরিস্থিতি এখনো মোটামুটি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে দেশে উৎপাদিত অকটেন সরবরাহে মেঘনা ও যমুনার অনিয়ম থাকায় ভোক্তারা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। এর কারণ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকেই ব্যাখ্যা করতে হবে। প্রতিদিন দুপুরের পর জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতেও একই প্রক্রিয়া চলবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, সংকট নিরসনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর নজরদারি আরও জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে কুমিল্লাসহ সারাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।