ঢাকা: বাইরে কাঠফাটা রোদ আর গুমোট গরম। ভেতরে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন। কিন্তু এসব ক্লান্তি আর ভোগান্তিকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিচ্ছে একঝাঁক শিশু-কিশোর। তাদের চোখজুড়ে তখন অচেনা এক কৌতুহল, কখন শুরু হবে শো? কখন তারা হারিয়ে যাবে গ্রহ-নক্ষত্রের দেশে!
পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে রাজধানী ঢাকার বিজয় সরণির ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’ প্রাঙ্গণে দেখা গেল এমনই এক উৎসবমুখর চিত্র। ঈদের আমেজে মুখর এই বিজ্ঞান ও বিনোদন কেন্দ্রে আজ তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
অনলাইনে বিভ্রাট, টিকিটের দীর্ঘ লাইন
অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রের মতো ঈদের এই ছুটিতে নভোথিয়েটারেও নামে মানুষের ঢল। তবে বিপত্তি বাঁধে সকালের দিকেই। দর্শনার্থীদের অতিরিক্ত চাপের কারণে হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ে নভোথিয়েটারের অনলাইন টিকিট সার্ভার। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ সনাতন পদ্ধতিতে (ম্যানুয়ালি) কাউন্টার থেকে টিকিট দেওয়া শুরু করে।
আর তাতেই বাধে বিপত্তি। কাউন্টারের সামনে মুহূর্তেই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে লাইন। একেকজন দর্শনার্থীকে টিকিটের জন্য ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে হাঁপিয়ে ওঠেন বড়রা।
লাইনের ভোগান্তি নিয়ে এক অভিভাবক মোহাম্মদ তুহিন ক্ষোভ ও স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, “ঘণ্টার ওপর লাইনে আছি। গরমে বাচ্চাটা কষ্ট পাচ্ছে। তবে বাচ্চাকে কথা দিয়েছিলাম তারার মেলা দেখাব, তাই কষ্ট হইলেও টিকিটটা পাইছি, এইটাই শান্তি!”
দিনে ৫টি শো: মহাকাশের হাতছানি
দর্শনার্থীদের এই উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এবং কাউকেও নিরাশ না করতে আজ দিনভর মোট ৫টি শো-এর ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। প্রতিটি শো শুরু হওয়ার আগেই হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ভেতরে ঢুকতেই বাইরের সব ক্লান্তি যেন কর্পূরের মতো উবে যায়। যখন হলরুমের বিশাল গম্বুজ আকৃতির স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সৌরজগতের গ্রহাণু, ছায়াপথ আর মহাবিশ্বের রহস্য—তখন পুরো হলরুম মুখর হয়ে ওঠে শিশুদের উল্লাসে।
ভোগান্তি ছাপিয়ে শিশুদের হাসিতে খুশি বাবা-মা
নভোথিয়েটার প্রাঙ্গণে এসে দেখা যায়, টিকিট কাটার সময় যে অভিভাবকদের মুখে বিরক্তির ছাপ ছিল, শো শেষে হল থেকে বের হওয়ার সময় তাদের মুখেই চওড়া হাসি। কারণ, তাদের সন্তানদের চোখে-মুখে তখন রাজ্যের আনন্দ আর বিস্ময়।
অন্ধকার ঘরে মহাকাশ ভ্রমণ শেষে উচ্ছ্বসিত ৮ বছরের শিশু রাফসান জানায়, “অনেকক্ষণ লাইনে থেকে পা ব্যথা হয়ে গিয়েছিলো । কিন্তু ভেতরে গিয়ে যখন বড় বড় গ্রহ আর তারা দেখলাম, খুব মজা পেয়েছি! মনে হয়েছে আমি মহাকাশে উড়ে বেড়াচ্ছি!”
সন্তানের এমন খুশিতে নিজেদের সব কষ্ট ভুলে গেছেন মা-বাবারাও। এ সময় শামীম আহমেদ তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, “ছুটির দিনে ঢাকায় বিনোদনের জায়গা তো খুব কম। এখানে এসে বাচ্চারা আনন্দের পাশাপাশি অনেক কিছু শিখতেও পারছে। টিকিট কাটার কষ্টটা গায়েই লাগছে না যখন দেখছি মেয়েটা হাসছে।”
দিনের শেষে টিকিট কাটার দীর্ঘ লাইনের ক্লান্তি হেরে গেছে শিশুদের নির্মল হাসির কাছে। আর এভাবেই যান্ত্রিক ঢাকার বুকে বিজ্ঞান আর আনন্দের মেলবন্ধনে কেটে গেল ঈদের আরেকটি রঙিন দিন।