রংপুর: রংপুর জেলার ৪০টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে অন্তত ২০টি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) থেকে ডিপো থেকে কোনো জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) বিকেল থেকে মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় মালিকরা বাধ্য হয়ে পাম্প বন্ধ করে দিয়েছেন। তেলবাহী লরিগুলো পার্বতীপুর ডিপোতে গিয়েও খালি হাতে ফিরে এসেছে। গঙ্গাচড়া উপজেলায় টানা পাঁচ দিন ধরে চারটি পাম্প বন্ধ রয়েছে। এতে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ঘুরতে বের হওয়া যানবাহন চালক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুর নগরীর ব্যাংকের মোড়, সিওবাজার, ঢাকা-রংপুর হাইওয়ের পলাশবাড়ী থেকে মডার্ন মোড় পর্যন্ত অধিকাংশ পাম্প বন্ধ। যে কয়েকটি খোলা আছে, সেখানে শুধু সীমিত পরিমাণে ডিজেল ও পেট্রোল মিলছে। একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার পেট্রোল ও ৫০০ টাকার ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের পাম্পগুলোতে প্রায় সব ধরনের জ্বালানি শূন্য।
গঙ্গাচড়া উপজেলার শিহাব, শাহ আলম, মিম ও অন্যান্য পাম্পের সামনে দড়ি টানা, তালা ঝুলছে। বুড়িরহাট এলাকার মিম ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল নিয়ে এসে হতাশ সাকিব আল হাসান বলেন, ‘তেল শেষ, হেঁটে হেঁটে এসেছি। পাম্পে কিছু নেই, বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হবে।’
শাহ আলম ফিলিং স্টেশনের সামনে শাহীন আলম জানান, ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে গ্রামে এসেছি। মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরবো বলে পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু কোথাও পেট্রোল পাচ্ছি না—এটা অসহ্য ভোগান্তি।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের আনুর বাজারে আজিবর রহমান ও বেতগাড়ির আব্দুল খালেকের মতো অনেকেই পাম্প ঘুরে খালি হাতে ফিরে খোলাবাজার থেকে ২০০-২৫০ টাকা লিটারে পেট্রোল কিনেছেন। পীরগাছা উপজেলার আমিরুল ইসলামও একই অভিযোগ করেন।
মালিকরা জানিয়েছেন, পাঁচ দিন পর ডিপো থেকে সরবরাহ এলেও শুধু ডিজেল দেওয়া হয়েছে। পেট্রোল ও অকটেন না থাকায় গ্রাহকদের চাপ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রংপুর জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তফা মহসিন বলেন, ‘ডিপো থেকে জ্বালানি না পাওয়ায় তেল বিক্রি করতে পারছি না। জেলার ২০টির বেশি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।’
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জেসমিন আক্তার বলেন, ‘সকালে বিষয়টি জেনেছি। মালিকরা আনুষ্ঠানিকভাবে জানালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো। তবু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি, দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। পাম্প কর্মীরা জানান, দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী ৯ হাজার লিটার তেল পাওয়ার কথা থাকলেও এখন মাত্র ২ হাজার লিটার পেট্রোল আসছে।
নগরির সবথেকে বড় পাম্ব মেসার্স ইউনিক ট্রেডার্সের বা শাপলা পাম্বের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারুফুল ইসলাম সিফাত বলেন, ‘ঈদের মার্কেটে দৈনিক ২০ হাজার লিটার লাগবে, কিন্তু আজ ডিজেলও পাইনি। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।’
মিঠাপুকুর উপজেলার সঞ্চিতা ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী টিটুল জানান, ২০০-৩০০ টাকার তেল দিচ্ছি, অনেকে রাগারাগি করছে। আমাদের করার কিছু নেই।
সংকটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের অন্য জেলায়ও। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সূত্র মতে, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরে মাত্র কয়েকটি পাম্প সীমিতভাবে চালু, বাকিগুলো শূন্য।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সারাদেশে সরবরাহ ঘাটতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে যেকোনো সময় পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জেলা প্রশাসনের নজরদারির অভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে সরকারের দাবি, দেশে এক মাসের মজুদ রয়েছে এবং রেশনিং তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে ডিপো থেকে সরবরাহ না বাড়ায় সংকট অব্যাহত।
তবে ভুক্তভোগীরা সিন্ডিকেটের আশঙ্কা করছেন—পাম্পে তেল নেই, অথচ খোলাবাজারে চড়া দামে মিলছে। দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি ও নজরদারি না বাড়ালে এই সংকট জনদুর্ভোগে রূপ নেবে এবং পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।