Wednesday 25 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুরে মশার ‘কারখানা’ দুই খাল: ২০ বছরেও কাটেনি ডেঙ্গু আতঙ্ক

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:২৯

রংপুর: রংপুর নগরবাসী এখন মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। নগরীর প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার, দখল ও দূষণে ভরে থাকায় পরিণত হয়েছে মশা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্রে।

গত দুই দশকে খাল দুটির সংস্কারে প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয় হলেও সন্ধ্যা নামলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণে দিন-রাত অস্থির হয়ে পড়েছেন প্রায় দশ লাখ নগরবাসী। স্প্রে-কয়েল-রিপেলেন্ট কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। ফলে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার আতঙ্কে দিন কাটছে তাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেন-ডোবা পরিষ্কার, কীটনাশক প্রয়োগ, দখল উচ্ছেদ ও নিয়মিত মনিটরিং ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

নগরির চিকলি এলাকার বাসিন্দা তারিকুল ইসলাম। দুশ্চিন্তায় আছেন নবজাতক, বৃদ্ধ পিতা-মাতাসহ পরিবারের বাকী সদস্যদের নিয়ে। গেল বছর নিজেই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে। তার মনে এখন উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তা। তিনি বলেন, ‘ঘরে মশা, বাইরে মশা—যেখানেই যাই মশা। সন্ধ্যার পর মনে হয় মশা যেন তুলে নিয়ে যাবে।’
একই ভাবনা ডিসির মোড়ের সিমি আক্তারের মনেও। তিনি জানান, ছোট শিশু থাকায় দিন-রাত দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। চারতলা মোড়ের ফয়সাল আহমেদের অভিযোগ, ‘আগে ধোঁয়া মারতো, এখন সেটাও দেখা যায় না।’

ধাপ, মুন্সিপাড়া, কেরানীপাড়া, ইঞ্জিনিয়ারপাড়া, গোমস্তাপাড়া, সেনপাড়া, মুলাটোল, তেঁতুলতলা, নূরপুর, বৈরাগীপাড়া, মাহিগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এই দুর্ভোগ সবচেয়ে তীব্র। উপজেলাগুলোতেও হঠাৎ মশা বেড়েছে।

হটাৎ করেই এতো কেনো মশা?

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপনের মতে, মশার এই উপদ্রব শুধু রংপুরের নয়—গোটা দেশের সমস্যা। তিনি বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ইউনিয়ন-উপজেলা-জেলা পরিষদ-সিটি করপোরেশন পুরোপুরি ভঙ্গুর ছিল, যার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়া দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ড্রেন-ডোবা-নর্দমার পানি স্থির হয়ে পচেছে; এখন বসন্তের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মশার বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া।’

তিনি বলেন, এখন যে মশা আছে তার ৯২ শতাংশই কিউলেক্স, যা পচা পানিতে জন্মায়। ফগিং শুধু নাগরিকদের খুশি করার কিন্তু উন্নত দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে এটি নিষিদ্ধ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৯০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে চারজনের। রংপুরেও গত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল উল্লেখযোগ্য।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জাকির হোসেন জানান, কয়েলের ধোঁয়া শিশু-বয়স্ক সবার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ; তাই মশারি ব্যবহার ও আশপাশের জমা পানি-আবর্জনা পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

অতীতের প্রচেষ্টা থাকলেও বর্তমানে ব্যর্থ প্রচেষ্টা

১৮৯০ সালে রংপুরের ডিমলার রাজা জানকী বল্লভ সেন তার মা শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল খনন করিয়েছিলেন ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য। একসময় নগরের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত খালটি এখন দখল-দূষণে সরু নালায় পরিণত। কেডি খালের অবস্থাও একই। সূত্র বলছে, গত দুই দশকে বিভিন্ন প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

২০২৪ সালে একদিনে ৫ কিলোমিটার পরিষ্কার হয়। ২০২৫ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে প্রায় ১৫ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়—খনন, ড্রেজিং, সবুজায়নসহ। হাইকোর্ট ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খাল পুনরুদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেন; জুলাইয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রকল্প ঘোষণা করেন। নভেম্বরে উদ্বোধন হয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চেও খাল দুটি এখনও মশার ‘কারখানা’।

আর বর্তমান প্রচেষ্টা হিসেবে রংপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখার প্রধান মিজানুর রহমান মিজু জানান, এবার মশা বেশি, তাই ১০ হাজার লিটার ওষুধ, ৮০টি নতুন ফগার মেশিন ও ৬৬টি হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কেনা হয়েছে। রমজানের কারণে পূর্ণমাত্রায় অভিযান শুরু করা যায়নি, তবে কয়েকটি এলাকায় শুরু হয়েছে—পর্যায়ক্রমে ৩৩ ওয়ার্ডে চলবে।

পরিবেশবিদ নগর বিশেষজ্ঞ মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, ‘শুধু ফগিং বা অস্থায়ী পরিষ্কার নয়—মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করতে হবে। ড্রেন-ডোবা পরিষ্কার, কীটনাশক প্রয়োগ, দখল উচ্ছেদ ও নিয়মিত মনিটরিং ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।’

প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ চায় নগরবাসী

নির্বাচন আসে-যায়, প্রতিশ্রুতি থাকে কিন্তু থেকে যায় দীর্ঘশ্বাস ও আতঙ্ক। নগরবাসীর জীবনযাত্রায় বছরের পর বছর একই চিত্র। জাতীয় নির্বাচন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন আসে, প্রার্থীরা ইশতেহারে শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল সংস্কার, মশা নিধনের প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সব ভুলে যান। এমপি-মেয়ররা শপথ নিয়ে যান, কিন্তু খালের দখল-দূষণ, জলাবদ্ধতা আর মশার উপদ্রব অটুট থাকে। বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ দেখেছে রংপুর; এবারও স্বস্তি নেই দুই খালকে ঘিরে মশার বংশবিস্তারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে নগরবাসী।

নগরির বিকন মোড়ের বাসিন্দা আব্দুল হাই প্রধান বলেন, ‘নির্বাচন এলেই নেতারা আসেন, খাল পরিষ্কারের কথা বলেন। শপথ নিয়ে চলে যান, আর খোঁজ নেন না। আমরা মশার কামড়ে রাতে ঘুমাতে পারি না, বাচ্চারা পড়াশোনা করতে পারে না।’

নূর নবী নামে আরেকজন বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভয়ে আতঙ্কে থাকি। গতবার অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। এবারও একই অবস্থা খাল পরিষ্কার না হলে কীভাবে মশা কমবে?’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর