Saturday 28 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুরের ‘রক্তগৌরব’: রংপুরের মানুষের জন্য স্মরণীয় বীরত্বগাঁথার দিন

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৫ | আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৮

‘রক্তগৌরব’ স্মৃতিস্তম্ভ।

রংপুর: রংপুরের মানুষের জন্য আজ ২৮ মার্চ স্মরণীয় সেই বীরত্বগাঁথার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র তিন দিনের মাথায় এই দিনে বাঁশের লাঠি, তীর-ধনুক, দা-কুড়াল, বল্লম নিয়ে রংপুর সেনানিবাস ঘেরাও করে ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল অকুতোভয় বীর মানুষরা।

স্বাধীনতার ঘোষণার মাত্র দু’দিন পর রংপুর ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণে নিসবেতগঞ্জ ও ঘাঘট নদীর পাড়ে জড়ো হয়েছিলেন হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা। হাতে লাঠি-সোঁটা, তীর-ধনুক, বল্লম, দা-কুড়াল। ওঁরাও, সাঁওতালসহ আদিবাসী-বাঙালি একসঙ্গে সেনানিবাস ঘেরাও করতে এগিয়ে যান। পাকিস্তানি মেশিনগানের গুলিতে ৪০০ গজের মধ্যে লুটিয়ে পড়েন শত শত বীর। মৃত-অর্ধমৃত প্রায় ৫০০-৬০০ জনের লাশ পেট্রল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়। এই অমর আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষায় ২০০২ সালের ২১ নভেম্বর নিসবেতগঞ্জে উদ্বোধিত হয়েছে ‘রক্তগৌরব’ স্মৃতিস্তম্ভ।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্বে এটিই ছিল পাকিস্তানি সেনানিবাসের বিরুদ্ধে সাধারণ জনতার প্রথম সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ। ২৫ মার্চের কালরাতে রংপুরে পাকবাহিনীর হামলা ও বাঙালি সৈনিকদের হত্যার তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত জনতা সংগঠিত হয়ে ওঠেন। ২৭ মার্চ রাতে স্থানীয় ভাষা সৈনিক আওয়ামী লীগ নেতা মজিবর রহমান মাস্টার, অ্যাডভোকেট গণি মিয়া, কবি শেখ আমজাদ হোসেনসহ নেতৃবৃন্দ গ্রামে গ্রামে ঢোল বাজিয়ে, সভা করে প্রস্তুতি নেন। ওঁরাও সম্প্রদায়ের বুদু ওঁরাও ও সাঁওতাল নেতা জয়রাম সরেনের নেতৃত্বে আদিবাসীরা ‘সিং বোঙ্গা’ (সূর্যদেবতা)-র পূজা করে যুদ্ধের শপথ নেন।

২৮ মার্চ ভোর থেকে রংপুরের উত্তম, রাজেন্দ্রপুর, পাগলাপীর, সাহেবগঞ্জ, নজিরেরহাট, লাহিড়িরহাট, কেরানীরহাট, শ্যামপুর, পালিচড়া, বুড়িরহাট, গঙ্গাচড়া, দমদমা, মিঠাপুকুর, বলদীপুকুর, রানীপুকুর, তামপাট, দামোদরপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ ঘাঘট নদীর পাড়ে জড়ো হন। বিকেল ৪টা-৫টার দিকে স্লোগানে প্রকম্পিত নিসবেতগঞ্জ এলাকা থেকে জনতা ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হয়। সেনানিবাসের মাত্র ৪০০ গজের মধ্যে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ মালিকের নেতৃত্বাধীন বাহিনী (২৩তম ব্রিগেড, ট্যাঙ্ক ব্যাটালিয়নসহ) মেশিনগান চালিয়ে দেয়। মাত্র ৫ মিনিটের গুলিবর্ষণে শত শত মানুষ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘাঘট নদীর তীর সবুজ মাঠ রক্তসাগরে পরিণত হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষ্য ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে নিহতের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০-এর কাছাকাছি। অনেক লাশ ট্যাংক দিয়ে পিষে ফেলা হয় বলে পূর্ণ তালিকা আজও অসম্পূর্ণ। এ ঘটনার পর অনেক ওঁরাও-সাঁওতাল ভারতে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

২৯তম ক্যাভালরি রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিন তার বইয়ে লিখেছেন, ‘আহতদের আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়ে ওঠে… ৫০০-৬০০ লাশ পেট্রোলে পুড়িয়ে ফেলা হয়। সেই আগুন অন্য যেকোনো আগুনের চেয়ে লাল ছিল।’

এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিরল—সাধারণ জনতা ও আদিবাসীদের হাতে তৈরি অস্ত্র দিয়ে সরাসরি ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ। এর আগে ২৪ মার্চ নিসবেতগঞ্জে কসাই শহীদ আলী এক পাক সেনার জিপ আক্রমণ করে এক সৈন্যকে হত্যা করেন, যা পাক বাহিনীকে আরও ক্ষিপ্ত করে। ঘটনাটি পরবর্তীতে লেখক আনিসুল হকের উপন্যাসেও উঠে আসে।

সেই রক্তস্নাত স্মৃতি ধরে রাখতে ২০০০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০২ সালের ২১ নভেম্বর মেজর জেনারেল আ ত ম জহিরুল আলমের উদ্বোধনের মাধ্যমে ‘রক্তগৌরব’ স্মৃতিস্তম্ভের যাত্রা শুরু হয়। প্রতি বছর ২৮ মার্চ ‘রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস’ পালিত হয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক নূরুল আমিন বলেন, ‘এই স্মৃতিস্তম্ভ শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি সাধারণ মানুষের অসম সাহস, আদিবাসী-বাঙালির ঐক্য এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বড় বেসামরিক প্রতিরোধের জ্বলন্ত সাক্ষী। আজও ঘাঘটের তীরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সেই রক্তের ঋণ শোধ করতে আমরা কতটা প্রস্তুত?’

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা প্রমাণ করে অস্ত্রহীন জনতাও যুদ্ধে নামলে ইতিহাস রচনা করতে পারে। রক্তগৌরব আজও সেই অমর আত্মত্যাগের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর