Tuesday 07 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’
এবার ৫ প্রতীকী নিয়ে সাজছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’

কানজুল কারাম কৌষিক, ঢাবি করেস্পন্ডেন্ট
৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০১ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে বৈশাখী শোভাযাত্রার জন্য তৈরি নানা মোটিফ। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে এই আবাহন নিয়ে বাংলা নববর্ষের নতুন ভোরে জেগে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতি। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই বর্ষবরণের আয়োজন থাকে উৎসবমুখর। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ‘বঙ্গাব্দ ১৪৩৩’ বরণে থাকছে বর্ণাঢ্য আয়োজন।

বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শোভাযাত্রা। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। বর্তমানে চারুকলা অনুষদে চলছে ঐতিহ্যবাহী এই শোভাযাত্রার প্রস্তুতি, যা এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে আয়োজন করা হবে।

বিজ্ঞাপন

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, “আমাদের এবার বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। আমরা এবার পাঁচটি বড় প্রতীকী রাখছি। একটি বড় মোরগ, নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতি, শান্তির পায়রা, বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে একটি বড় দোতারা থাকবে, টেপা আকৃতির ঘোড়া থাকবে। এ ছাড়াও থাকবে ছোট ছোট অনেক মোটিফ।”

তিনি আরও জানান, আগে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামের কথা বলা হলেও সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামেই অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক, আমরা তার অবসান চাই। পহেলা বৈশাখ মূলত সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও কৃষকের উৎসব। আমরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ গণতান্ত্রিক সরকার। গণতন্ত্রে বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্য থাকবে। এখন থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে।”

তিনি আরও বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণসহ অন্যান্য সকল আয়োজনই থাকবে। চারুকলা থেকে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার যে যে বৈশিষ্ট্য আছে, সবই থাকবে।’

নাম পরিবর্তনে শিক্ষার্থীদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

চারুকলা অনুষদের সিরামিক বিভাগের শিক্ষার্থী মাশরাফি ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক বিরাট অংশ দখল করে আছে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক ও বাহক। একটা জাতি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভাষা, ইতিহাস-ঐতিহ্য সবকিছুরই একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মিশ্রণ এই পহেলা বৈশাখ। সেখানে প্রতিবছর রাজনীতির প্রভাবে বিতর্ক তৈরি হয় এবং শোভাযাত্রার প্রেক্ষাপটকে একটি সমালোচনার মুখোমুখি ফেলা হয়। ফলে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিটিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শোভাযাত্রায় রাজনৈতিক ইঙ্গিত কি আদৌ বাঙালি সংস্কৃতি? আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষই প্রতিশোধ পরায়ণ হওয়ায় তাদের ভেতরকার হিংসাত্মক তৎপরতা, কুৎসিত মনোভাব ও নোংরা রাজনৈতিক প্রভাব এই শোভাযাত্রাকে ব্যাপকভাবে সমালোচনার মুখোমুখি করছে। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রগামী হই তবেই এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। বাংলা নতুন বছর সকলের জন্য মঙ্গলময় হোক।’

শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী দস্তগীর চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বোধ মানুষরা একটা সুন্দর জিনিসের নাগাল পেলে, অযথা টানাহেছড়া করে যে নোংরা অবস্থা করে, বারবার এই শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনকে আমি সেভাবেই দেখি।’

প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী অমি খান সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, “মঙ্গলশোভাযাত্রা শুধু একটি আয়োজন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে আমরা যখন রঙ, মুখোশ, মোটিফ আর শিল্পকর্ম নিয়ে রাস্তায় নামি, তখন সেটা কেবল উৎসব নয়—এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রকাশ। গতবছর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি পরিবর্তন হয়ে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ হয়েছিল। চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “একটি নামের ভেতরেও ইতিহাস, দর্শন ও সংগ্রামের স্মৃতি থাকে। ‘মঙ্গল’ শব্দটি আমাদের সামষ্টিক কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা বহন করে, আর ‘আনন্দ’ শব্দটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক উচ্ছ্বাসের দিকটি তুলে ধরে। এ বছর আবার নাম হলো ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। এই নামটি বৈশাখের উৎসব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। একজন শিল্প শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এটাকে দেখি সময়ের প্রতিফলন হিসেবে। সমাজ-রাজনীতি বদলায়, ভাষা বদলায়, কিন্তু শিল্প তার নিজস্ব ভাষায় টিকে থাকে। নাম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু চারুকলার শিল্পীদের সৃজনশীলতা, প্রতিবাদের ভাষা, আর সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা বদলায়নি। আমার কাছে শোভাযাত্রার মূল শক্তি তার চেতনায়—অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা ও বাঙালির ঐতিহ্যের উদযাপন।”

ইউনেস্কোর স্বীকৃতির বিষয়ে কী হবে?

ইউনেস্কো’র অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় এখনো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ শিরোনামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংস্থাটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে তারা কোনো অবস্থান নেয় না। তবে সরকার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করতে হয়। এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নাম পরিবর্তনের বিষয়টি ইউনেস্কোকে জানিয়ে দেব।’

ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও নির্দেশনা

নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মুখোশ পরে ও ব্যাগ বহন করে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে, চারুকলার তৈরি মুখোশ হাতে বহন করা যাবে। ভুভুজেলা বাজানো বা বিক্রিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সব কর্মসূচি বিকেল ৫টার মধ্যে শেষ করতে হবে।

‘বৈশাখী শোভাযাত্রাটি’ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্য, দোয়েল চত্বর ও বাংলা একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হবে।

১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত যানবাহন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবে। পহেলা বৈশাখে কোনো ধরনের যান চলাচল, বিশেষ করে মোটরসাইকেল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য নির্ধারিত থাকবে একাধিক গেট, যাতে দর্শনার্থীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা যায়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর