ঢাকা: আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা শুরু হওয়ায় দেশে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্য বাড়ার কারণে রাজধানীর সড়কে গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচল দৃশ্যমানভাবে কমেছে। ফলে রাজধানীর চিরচেনা যানজটের দৃশ্য কয়েকদিন ধরে তেমন চোখে পড়ছে না।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর মিরপুর, উত্তরা, বনানী, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার মোড়, পল্টনের মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলো যেখানে সাধারণত দিনের অধিকাংশ সময় স্থবির হয়ে থাকত যানবাহনে, সেখানে বর্তমান চিত্র ভিন্ন। প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে যাত্রীদের। জ্বালানি খরচ বাঁচাতে অনেক পরিবহন মালিক তাদের বাসের বড় একটি অংশ বসিয়ে রেখেছেন।
অন্যদিকে, মধ্যবিত্তের ভরসা রাইড শেয়ারিং সেবা বা ব্যক্তিগত গাড়িও এখন সড়কে কম দেখা যাচ্ছে। ব্যয়বহুল জ্বালানি সাশ্রয় করতে অনেকেই এখন পায়ে হাঁটা বা অন্য কোনো মাধ্যমের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে বাসের ওপর চাপ আরও বাড়ছে, কিন্তু বাসের সংখ্যা বাড়ছে না।
রাজধানীর বাংলামোটরে বাসের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী শিমুল পারভেজ সারাবাংলাকে বলেন, তেলের সংকটের মধ্যে দাম বাড়ানো হয়েছে। বাস মালিকরা বেশি ভাড়া আদায়ের জন্য গাড়ি কম নামাচ্ছে। তাই অফিসে যেতে ও অফিস শেষে বাসায় যেতে বাসের জন্য অনেকটা সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
আদাবরে বসবাসকারী যাত্রী রেহানা সুলতানা সারাবাংলাকে বলেন, বনানীতে আমার অফিস। কিন্তু গাড়ি খুবই কম। ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে বাসের দেখা পেতে।
রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে চলাচল করা তাশরিফ সারাবাংলাকে বলেন, তেলের সংকট হওয়ার পর গাড়ি গ্যারেজে রেখে দিয়েছি। দীর্ঘ লাইন ধরে তেল নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। এখন বাস ও মেট্রোরেলে চলাচল করছি।
পরিবহন মালিকদের দাবি, বর্তমান তেলের দামে গাড়ি চালিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। তাই সরকার ভাড়া বাড়ানো পর্যন্ত অনেকেই সড়কে গাড়ি নামাচ্ছেন না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই সংকট কাটাতে গণপরিবহন ব্যবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ দরকার। সেই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। রাজধানীর ফাঁকা রাস্তা হয়তো সাময়িকভাবে যানজট থেকে মুক্তি দিচ্ছে, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা অর্থনৈতিক মন্দা ও মানুষের ভোগান্তি আগামীর জন্য এক অশনি সংকেত।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারের অস্থিরতার দোহাই দিলেও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। দ্রুত বিকল্প জ্বালানি এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না করলে ঢাকার সচলতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এর আগে, পরিবহন মালিক–শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল রাতে বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ে বাসের ভাড়া পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বৈঠক হয়। কিন্ত বৈঠকের পর বিআরটিএ চেয়ারম্যান জানান, ভাড়া বিষয়ে একটি খসড়া করা হয়েছে, দ্রুতই মন্ত্রণালয় থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে। তার আগে গত ১৪ এপ্রিল রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেনের দাম ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। গত ১৯ এপ্রিল থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়।