ঢাকা: সংসদে পাস হওয়া সংশোধিত “ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬” দেশের ব্যাংক খাতকে আবারও ঝুঁকির মুখে ফেলতে যাচ্ছে। এই আইনের ১৮(ক) ধারার সুযোগ নিয়ে অতীতে যারা দেশের ব্যাংকিং খাতকে পরিকল্পিতভাবে লুট করেছে তাদেরকে আবারো মালিকানায় আসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) ঢাকার কাওরান বাজারে বিডিবিএল ভবনে “ভয়েস ফর রিফর্ম” আয়োজিত ” সংশোধিত ব্যাংক রেজোলিউশন আইন – ২০২৬: আবারও ঝুঁকির মুখে ব্যাংকিং খাত” শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অপসারিত স্বৈরাচারী সরকারের সময়কালে অর্থনীতির যেসকল খাত পরিকল্পিত উপায়ে ধ্বংশ করা হয়েছিল তার মধ্যে ব্যাংকিং খাত অন্যতম। গত দেড় যুগ গুটিকয়েক অলিগার্ক লক্ষ কোটি টাকা ব্যাংকিং খাত থেকে লুট করে। ২০২৪ সনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার পরেও বিভিন্ন ব্যাংক এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারে নাই। এখনো লাখ লাখ আমানতকারী তাদের সঞ্চয় ফেরত পায় নাই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নের মাধ্যমে কয়েকটি রুগ্ন ব্যাংকে একীভূতকরণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। সরকার ৩৫ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যেই এই ব্যাংকগুলোতে দিয়েছে। কিন্তু এই অধ্যাদেশ সংশোধন করে সম্প্রতি যে আইন সংসদে পাশ করা হয়েছে তাতে নতুন একটি ধারা (১৮-ক) যোগ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অল্প কিছু টাকা দিয়ে অতীতের শেয়ারহোল্ডাররা আবারো ব্যাংকিং খাতে ফিরে আসতে পারবে ও একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
বক্তারা বলেন, এই সুবিধা শুধু অনৈতিকই না, বরং ভবিষ্যতে এটি ব্যাংকিং খাতকে আরো বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।
লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোসতাক খান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত ছিল যেসকল ব্যক্তি ব্যাংক লুটের সাথে জড়িত ছিল তাদের সকল সম্পদ সরকারিকরণ বা ক্রোক করা। কিন্ত তারা এটি না করে বড় ভুল করেছে। তিনি বলেন যারা ব্যাংক লুট করেছে তারা এমনভাবে করেছে যে তাদের বন্ধককৃত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ব্যাংকগুলোর ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে না।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় এর ব্যবসা বিভাগের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন যে সংশোধিত আইনের ১৮(ক) ধারা ব্যবহার করে এস আলম ও তার সাথে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য রুগ্ন ব্যাংকগুলো না। বরং দেশের অন্যতম সফল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংককে আবারো দখল করা। এটি করতে তাদের খুব বেশি টাকা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না নতুন এই সংশোধনীর জন্য।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এস আলম ইসলামী ব্যাংক দখল করতে যাদের ব্যবহার করেছেলিন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তিনি বলেন যে এটি দুর্ভাগ্যজনক যে এস আলমের ব্যাংক লুটের সহযোগীর যেখানে জেলে থাকার কথা, সেখানে তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রপতির পদে বসে আছেন। তিনি বলেন যে যতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত নিয়ে লুটপাট চলতেই থাকবে।
এনসিপির সারোয়ার তুষার বলেন যে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২ মাসের মধ্যেই অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দলীয়করণের চরম উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসাবে দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যার সাথে এস আলমের অতীত সম্পর্কের কথা সংবাদে এসেছে। বিতর্কিত এস আলমের সাথে সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সম্পর্ক আছে। জ্বালানি খাতের মতো ব্যাংকিং খাতে আরও একটি মহা বিপর্যয় আসন্ন।
ভয়েস ফর রিফর্ম এর সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন বিআইবিএম এর প্রাক্তন মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সিএফএ এসোসিয়েশনের সভাপতি আসিফ খান, প্রথম আলোর হেড অফ অনলাইন শওকত হোসেন মাসুম ও গার্মেন্টস উদ্যোক্তা বাংলাদেশ থাই চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ।