রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য পদে অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে দেওয়া নিয়োগপত্র জারির এক ঘণ্টার মধ্যেই বাতিল করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে তাকে অপসারণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীকে বহাল রাখা হয়েছে।
অধ্যাপক আনিসুর আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের বোনের স্বামী হিসেবে পরিচিত—এই ‘আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা’ নিয়েই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েই তার নিয়োগ বাতিল করা হয়।
কী ঘটেছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেরোবির উপাচার্য পদে অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং-৩৭.০০.০০০০.০৭১.১১.১৮১.২২-২০৭) জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন জারির মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই একই দিনে আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা বাতিল করা হয়।
বাতিলের আনুষ্ঠানিক কারণ
নতুন প্রজ্ঞাপনে (সহকারী সচিব মো. সুলতান আহমেদের সই করা) বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের ১৪ মে, ২০২৬ তারিখের দুইটি স্মারক (২০৬ ও ২০৭ নম্বর) বাতিল করা হলো। ফলে—২০৬ নম্বর স্মারক বাতিল মতে বেরোবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশটি বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ তিনি আপাতত বহাল থাকছেন। আর ২০৭ নম্বর স্মারক বাতিল মতে অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমানকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের আদেশটি বাতিল হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে ‘জনস্বার্থে’ এই আদেশ জারি বলা হলেও, সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা ও রাজনৈতিক পটভূমি নিয়েই দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কেন বিতর্ক?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান আহমেদের বোনের স্বামী। এই ‘আত্মীয়তার সুবাদে’ দ্রুত নিয়োগ ও আওয়ামী লীগপন্থ পরিচয় নিয়ে সমালোচনা তীব্র হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাকফুটে যায়। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করে জানান, ‘বিষয়টি শীর্ষ পর্যায়ে আলোচিত হওয়ার পর পরই প্রজ্ঞাপন জারির এক ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।’
আইনি প্রেক্ষাপট
আদিতে অধ্যাপক আনিসুরকে দেওয়া নিয়োগপত্রে বলা হয়েছিল, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৯ এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমোদনক্রমে’ এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে একই প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল, ‘প্রয়োজনবোধে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য যে কোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।’ সেই শর্ত অনুযায়ীই শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুততম সময়ে প্রজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয়।
বর্তমান অবস্থা
এখন পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাতিলকরণ প্রজ্ঞাপন কার্যকর রয়েছে। ফলে অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীই বেরোবির দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে বহাল থাকবেন। তবে নতুন করে উপাচার্য নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে কি না—তা নিশ্চিত নয়। উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক সমিতির মধ্যে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা দেয়।
আওয়ামী লীগের পতনের পর (২০২৪ সালের পরবর্তী প্রেক্ষাপট) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তি’ বন্ধে কঠোর অবস্থান নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অধ্যাপক আনিসুরের নিয়োগ বাতিলকে সেই নীতিরই ধারাবাহিকতা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করলেও তার কোনো প্রশাসনিক দক্ষতা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।