রংপুর: নির্মাণ শেষেও দীর্ঘ ছয় বছর অলস পড়ে থাকার পর অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল। রোববার (৩১ মে) বিকেলে হাসপাতালটির অবকাঠামো পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত এই হাসপাতাল চালু করতে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নির্মাণ শেষ হওয়ার ছয় বছর পর রংপুরের জন্য এটি ছিল দারুণ খবর। প্রায় ৩১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ২০২০ সালের ৮ মার্চ ভবনটি হস্তান্তর করা হলেও দফতরী জটিলতা, জনবল সংকট ও অর্থ বরাদ্দের অভাবে এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
করোনাকালীন সময়ে কিছুদিন হাসপাতালটি আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও মূল চিকিৎসা সেবা চালু করা যায়নি। হাসপাতালটির অচলাবস্থার কারণে রংপুর অঞ্চলের অভিভাবকদের শিশুদের চিকিৎসার জন্য অনেক দূরবর্তী হাসপাতালে যেতে হতো, যা আর্থিক ও মানসিকভাবে তাদের জন্য ছিল কষ্টদায়ক।
গত ১০ মে রংপুরসহ সারাদেশের ছয়টি শিশু হাসপাতাল চালু করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরেজমিনে পরিদর্শন করে আগামী ২ জুনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় পুরো টিম নিয়ে রংপুরে আসেন ডা. নাজমুল হোসেন।
ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, ‘দেশের শুধু ছয়টি শিশু হাসপাতালই নয়, স্বাস্থ্য বিভাগে এ ধরণের আরো অনেক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো চালু হয়নি। বিষয়টি নজরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সেগুলো চালু করার নির্দেশ দেন।’
তিনি আরও জানান, পুরো ভবনটি পরিদর্শন করে তিনি বেশ সন্তুষ্ট এবং এটি একটি সুন্দর স্থাপনা। ‘এটি চালু করা গেলে রংপুর বিভাগের শিশু চিকিৎসায় মানুষ উপকৃত হবেন,’ বলেন তিনি।
ডা. নাজমুল হোসেন স্বীকার করেন, সরকারি যেকোনো জিনিস চালু করতে গেলে প্রশাসনিক কিছু জটিলতা থাকে। তবে কীভাবে সেটি সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী যেহেতু সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং প্রধানমন্ত্রী জোড়ালো ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন, সেহেতু হয়তো খুব অচিরেই আমরা এই প্রতিষ্ঠানটি চালু করতে পারবো।’
তিনি জানান, ঢাকায় ফিরে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবেন। এছাড়া ঠাকুরগাঁওয়ের পুরোনো ক্যাম্পাসে আগামী বছর থেকে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ভর্তির কাজ শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
ডা. নাজমুল হোসেন ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি না হয় সেদিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা ভবন নির্মাণ করতে চাই। যাতে ভবন নির্মাণ হলো কিন্তু চালু করা গেলো না – এমনটি না হয়।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সদর হাসপাতালের ১ একর ৭৮ শতাংশ জমিতে তিনতলা এই হাসপাতাল ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি ১০০ শয্যার জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেলেও অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় তা কার্যকর হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই হাসপাতালটি চালু হলে রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার প্রায় ২ কোটি মানুষের উন্নত শিশু চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে। এতে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, অস্ত্রোপচার ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা থাকবে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় হাসপাতালটির কিছু সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর কিছুটা ক্ষতি হয়েছে বলেও জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের আশাবাদী বক্তব্যে রংপুরবাসী দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত এই হাসপাতালটি দ্রুত চালু হবে বলে আশা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি চালুর দাবি জানিয়ে আসা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহামুদুল হকের প্রশ্ন, জনগণের টাকায় নির্মিত এই হাসপাতাল কেন এতদিন পরিত্যক্ত পড়ে ছিলো— তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এখন সবাই অপেক্ষা করছে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিবেদন এবং মন্ত্রণালয়ের দ্রুত সিদ্ধান্তের দিকে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো রংপুরের এই শিশু হাসপাতালটি পূর্ণোদ্যমে চালু হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।