রংপুর: ঢাকের তালে, শিউলির সুবাসে আর কাশফুলের শুভ্রতায় চারিদিকে ছড়িয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা, শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ সূচনা। তাইতো প্রতিমায় রঙ-তুলির আঁচড়, মণ্ডপ সাজানো ও আলোকসজ্জার কাজে এতোদিন ব্যস্ত সময় পার করেছেন কারিগর ও আয়োজকেরা। এরই মধ্যেই শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে রংপুর মহানগর ও জেলার আট উপজেলায় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে ৯৬৪টি পূজামণ্ডপে। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে ইতিমধ্যে চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটি জানিয়েছে, মণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করবেন মণ্ডপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রংপুর মহানগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে এবার ১৬৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় মহানগরীতে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ১০টি। এ ছাড়া জেলার আট উপজেলায় ৮০০টি মণ্ডপে পূজা হবে। এর মধ্যে রংপুর সদরে ৯৪টি, গঙ্গাচড়ায় ৯৯টি, তারাগঞ্জে ১৬৫টি, বদরগঞ্জে ১২৫টি, মিঠাপুকুরে ১৫১টি, পীরগঞ্জে ১০০টি, পীরগাছায় ৯১টি এবং কাউনিয়ায় ৭৫টি মণ্ডপ রয়েছে।
জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের তদারকিতে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রতিটি পূজামণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পূজা শুরুর আগেই এসব চাল মণ্ডপ কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রংপুর জেলা প্রশাসন সিসিটিভি ক্যামেরার পাশাপাশি নাইট ভিশন ও রিচার্জেবল ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া রংপুর সিটি কর্পোরেশন এবার প্রতিটি পূজামণ্ডপে অনুদান ১৫ হাজার টাকায় উন্নীত করেছে, যা গত বছর ছিল ১৪ হাজার টাকা। বিসর্জনস্থলের পানি শোধন ও জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। প্রতিমাশিল্পীরা খড়, বাঁশ, সুতলি ও কাদা-মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির পর রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন দেবী দুর্গাকে। দেবী দুর্গার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা। এতোদিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছেন কারিগর ও আয়োজকরা।
আয়োজকেরা জানান, উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক সংকট ও দক্ষ কারিগরের অভাবে অনেক মণ্ডপে পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলা থেকে প্রতিমা সংগ্রহ করা হয়েছে। একটি প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিমা সংগ্রহ ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ করছেন তারা।
কাউনিয়ার নিলাম খরিদা সদরা সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শ্রী রজত চন্দ্র রায় বলেন, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলা সভাপতি রাম জীবন কুণ্ডু বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়ে আসছে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হবে বলে আশা করছি।’
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব পলাশ কান্তি নাগ ঝুঁকিপূর্ণ মন্দির-মণ্ডপ চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ, মনিটরিং সেল চালু, সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ মোবাইল টিমের মাধ্যমে টহল জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।
রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চারস্তরের নিরাপত্তার পাশাপাশি পূজামণ্ডপ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরাও কাজ করবে। আমরা সকলে মিলে সতর্ক থাকলে পূজায় কোনো বিশৃঙ্খলা হবে না।’
রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, ‘প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলো সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা যায়।’
পূজার সূচি অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। আজ ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এরপর ঢাকের বাদ্য, কাঁসর ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে পূজামণ্ডপগুলো। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের এ উৎসব। এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে আগমন করবেন এবং নৌকায় চড়ে গমন করবেন বলে ধর্মীয় বিশ্বাস।