জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপান সফর নিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
স্ট্যাটাসে তারেক রহমান বলেন, জাপানে তার ঐতিহাসিক সফর বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতি দুই দেশের অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপান্তর করা।
জ্বালানি নিরাপত্তায় ৩২ কোটি ডলার সহায়তা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে জাপানের পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় পাঁচ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।
এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং তরুণ কর্মশক্তির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতায় টেক পার্কের প্রস্তাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে সহযোগিতা, দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরের মধ্যে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিগ-বি উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা
শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় (বেই অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট-বিগ-বি) উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার অভিন্ন অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, নবায়িত সহযোগিতার আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা কামনা
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদাপূর্ণভাবে ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের অব্যাহত ও সক্রিয় সম্পৃক্ততা কামনা করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে জাপান বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থেকেছে।
জাপানের বন্ধুত্ব, উদারতা ও দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যখন নতুনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থবহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, জাপান সরকার ও দেশটির জনগণকে উষ্ণ আতিথেয়তা এবং বাংলাদেশের প্রতি অব্যাহত আস্থার জন্য ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও জাপানের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।