খুলনা: খুলনায় যেন থামছেই না হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। একের পর এক প্রাণহানিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। চলতি বছরের ১০ মাসে ৭৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
খুলনা জেলা পুলিশ ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত খুলনা মহানগরী ও জেলায় ৭৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মহানগরীতে ৩৭টি এবং জেলায় ৩৮টি।
সর্বশেষ সোমবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকা থেকে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের একজন মেহেদী হাসান (৩৫) এবং অন্যজন রেজাউল করিম (৩০)। এদিকে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহল বড় মসজিদের পেছনে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মহানগর তাঁতীদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে। এর আগের দিন রাতে নগরীর লবণচরা এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন শহীদুল শেখ (৩৫)। চলতি বছরের ৫ অক্টোবর রাতে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহল শহীদের মোড় ঢালী বাড়ির সামনে আক্তার ঢালী (৬০) নামের একজনকে গুলি করে হত্যা করে দূর্বৃত্তরা। গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকেও নৃশংসভাবে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এমন ঘটনা যেন খুলনার জন্য নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে, ৪ অক্টোবর দুপুর ১২টার দিকে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ফরমাইজখানা এলাকায় ফায়ার সার্ভিসের সামনে পূর্ব-বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (পিবিসিপি) নেতা মো. নাসিমুল করিমকে (৫৫) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ১২ সেপ্টেম্বর সকালে খুলনার দৌলতপুর থানার কুলিবাগান বটতলার অদূরে একটি অফিসের সামনে জলিল মুন্সি (৩৫) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার তিন দিন আগে ৯ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর তালুকদার কমিউনিটি সেন্টারের কাছে মোস্তাকিন (২৮) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে।
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। খুলনায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমায়ুন কবিরের হুমা বাহিনী, শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিম গ্রুপ। এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। জমি, মাছের ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও কোথাও কোথাও বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
খুলনা নগরীর ময়লাপোতা এলাকার আব্দুল গফ্ফার সারাবাংলাকে বলেন, ‘একসময় খুলনাকে শান্তির নগরী বলা হতো। বর্তমানে আতংকের শহরে পরিণত হয়েছে। প্রায় হত্যাকান্ড, হত্যাচেষ্টা ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। যে কারণে সাধারণ মানুষ আতংকের মধ্যে রয়েছে৷’
নগরীর বান্দাখাল এলাকার বাসিন্দা কবির শেখ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমানে খুলনা নগরীর খুব খারাপ অবস্থা। রাতের কথা বাদ দিলাম দিনের বেলাতেও বাইরে বের হতে ভয় লাগে। আমরা নগরবাসী শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘খুলনা একসময় শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন যেভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা কল্পনাও করা যাচ্ছে না। খুলনার বিভিন্ন উপজেলা ও নগরীতে প্রায়ই মানুষ খুনের ঘটনা ঘটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পর নির্বাচিত সরকার এলেও এখন পর্যন্ত খুলনার আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সন্ত্রাসী, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। ইতিমধ্যে নগরীর একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরা হয়েছে।’