।। আন্তর্জাতিক ডেস্ক।।
আজ থেকে ১৭ বছর আগের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে হামলে পড়েছিল চারটি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে নিউইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দু’টি এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগন ও পেনসিলভ্যানিয়ার স্নেকসভাইলে হামলা চালায় বাকি দু’টি উড়োজাহাজ। ‘নাইন-ইলেভেন’ নামে পরিচিত এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ওই হামলায় প্রাণ হারায় ২ হাজার ৭৫৩ জন। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৪২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। ভয়াবহ সেই হামলার ১৭ বছর পরও বাকি প্রায় ১১শ মানুষের কোনো পরিচয় এখনও জানা সম্ভব হয়নি!
আশার কথা, পরিচয় শনাক্ত করতে না পারা মরদেহগুলো নিয়ে এখনও অক্লান্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন গবেষকরা। নিউইয়র্কের একটি ল্যাবে গবেষকরা ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ ও অন্যান্য সংরক্ষিত নমুনা থেকে ডিএনএ উদ্ধারে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন।

নিউইয়র্কের মেডিকেল পরীক্ষা অফিসের ফরেনসিক জীববিজ্ঞানের সহকারী পরিচালক মার্ক ডিজায়ার বলেন, ‘প্রথমে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা নমুনাগুলোতে লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। তারপর সেগুলোকে এমন দু’টি রাসায়নিকের মধ্যে ডোবানো হয়, যা ডিএনএ শনাক্তে সহায়তা করে। তবে এ কাজে সফলতার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, ‘হাড় এমন এক কঠিন জৈবিক উপাদান, যা নিয়ে এ ধরনের কাজে ভীষণ বেগ পেতে হয়।’

মার্ক আরও বলেন, ‘কঠিন বিষয় হচ্ছে, গ্রাউন্ড জিরো থেকে তুলে আনা নমুনাগুলো আগুন, ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব, সূর্যালোক, বিমানের তেল ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি দ্বারা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যে সেগুলো থেকে ডিএনএ উদ্ধার করা প্রায় ভাগ্যের ব্যাপার। দীর্ঘদিন ধরে একটি নমুনা নিয়ে কাজ করার পর তা থেকে যে সংখ্যক ডিএনএ উদ্ধার হয়, তা পরিচয় শনাক্তে খুব একটা ফলপ্রসূ হয় না।’ তবে এরপরও থেমে নেই গবেষকরা। পরিচয় শনাক্তের জন্য একই প্রক্রিয়া বারবার অনুসরণ করে যাচ্ছেন তারা।

গবেষকরা জানান, হামলার পর থেকে টুইনে টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে ২২ হাজারেরও বেশি দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রতিটি নমুনা অন্তত ১০ থেকে ১৫ বার করে পরীক্ষা করা হয়েছে। সেগুলো থেকেই গবেষকদের বহুদিনের প্রচেষ্টায় ১ হাজার ৬৪২ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। বাকি ১ হাজার ১১১ জনের পরিচয় চিহ্নিত করার চেষ্টা এখনও সাফল্যের মুখ দেখেনি।
‘এমনও হয়েছে, টানা কয়েক বছর কাজ করেও একজনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তারপরও আমরা কেউ হাল ছেড়ে দিচ্ছি না। আমরা সেই শোকস্তব্ধ শুরুর দিনগুলোর মতোই সমান প্রতিশ্রুতিশীলতায় কাজ করে যাচ্ছি। একটাই প্রত্যাশা, যদি কিছু পাওয়া যায়,’- বলেন ডিজায়ার।
নিহতদের শনাক্ত করার এই প্রকল্পের বরাদ্দ সম্পর্কে কোনো তথ্য না দিলেও এটি যে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে সুসজ্জিত এবং উন্নত ল্যাব- সেটা জানান তিনি।

গবেষক দলের আরেক সদস্য ভেরোনিকা ক্যানো বলেন, ‘শেষ ব্যক্তিটির পরিচয় পাওয়ারও প্রায় এক বছর পর গত জুলাইয়ে স্কট মাইকেল জনসন নামে এক অর্থনীতি বিশ্লেষকের ডিএনএ শনাক্ত হয়। তথ্য মেলানোর পর জানা যায়, তিনি ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারের ৮৯ তলায় কাজ করতেন।’
ভেরোনিকা বলেন, ‘এটা খুবই সুখের অনুভূতি, এই ধরনের আবিষ্কার আমাদের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।’
‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছি না, তবে আমরা এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ছি। এটি এমন দায়িত্ব যা প্রত্যেককেই কিছু না কিছু প্রভাবিত করছে। তারপরও আমি পেশাদার হওয়ার চেষ্টা করি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মুখে একটু হাসি ফোটাবার চেষ্টা করি,’— বলেন এই গবেষক।

নিউইয়র্কের মেডিকেল পরীক্ষা অফিসের বিশেষায়িত ল্যাবটি কেবল ৯/১১ হামলায় নিহতদের পরিচয় শনাক্তেই পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া এখানকার গবেষকরা নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো থেকে দুই কিলোমিটার এলাকার মধ্যে অবস্থিত অন্যান্য অফিসেও তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
৯/১১ হামলার একটি ভয়েস গ্রুপের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা ব্র্যাডলি ফেটচেট বলেন, ‘ডিজায়ার হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি ম্যানহাটনের ওই ফরেনসিক দলের একমাত্র প্রবীণ সদস্য হিসেবে এখন পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আমার কাজটিও তার মতো অনুপ্রেরণার। আমরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও নতুন প্রাণের স্পন্দনের মতো চোখ মেলে স্বপ্ন দেখি। এটাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।’
সারাবাংলা/এএস