।। রিফাত রহমান, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট ।।
চুয়াডাঙ্গা: একসময় প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করেই কাটত তাদের অবসর। পরে সেই অবসরে তারা বেছে নিয়েছেন পাটজাত বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ। আর তাতেই দিন ফেরে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা খ্রিস্টান মিশন পল্লিতে। প্রায় চার দশক ধরে তারা যুক্ত হয়েছেন এই কাজে। বর্তমানে ওই খ্রিস্টান পল্লির একেকজন পাট পণ্য উৎপাদনের বিভিন্ন কাজ করে আয় করছেন ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।
কার্পাসডাঙ্গা খ্রিস্টান মিশন পল্লিতে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই খ্রিস্টান পল্লির মানুষদের খুব বেশি কিছু করার ছিল না। সামান্য আয়-রোজগারে ওই পল্লির বেশিরভাগ সদস্যকেই দারিদ্র্যে দিন কাটাতে হতো। পরে ১৯৭৬ সালে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার খ্রিস্টান মিশনারির উদ্যোগে এই পল্লিতে শুরু হয় পাটজাত পণ্য উৎপাদনের কাজ। পাট কিনে এনে দিয়ে মিশনারির নারী-পুরুষদের দিয়ে তৈরি করানো হতো কার্পেটসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। তাতে ক্রমেই স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন এই পল্লির নারী-পুরুষরা। দীর্ঘ ৪২ বছর পরও এখনও তারা ধরে রেখেছেন এই পাট পণ্য উৎপাদনের ঐতিহ্য।

কার্পাসডাঙ্গা খ্রিস্টান মিশন পল্লিতে গিয়ে দেখা যায়, মৃত বিশু মন্ডলের স্ত্রী সুলেখা মন্ডল (৬০) বাড়ির উঠানে ম্যাটের অংশবিশেষ তৈরি করছেন। ৪০ বছর ধরে এ কাজ করে আসছেন তিনি। ৭০-৮০ টাকা দরে পাট কেনেন তিনি। অবসর সময় অন্য কাজে ব্যয় করতে তিনি নারাজ।
পাশের বাড়ির সৌম মন্ডল (৬৭) ও তার স্ত্রী গীতা মন্ডলও (৬০) পাটজাত পণ্য তৈরি করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। গ্রাহকদের চাহিদামতো পণ্য তৈরিই তাদের ধ্যান-জ্ঞান।
গীতা মন্ডল জানালেন, পাট দিয়ে তৈরি ছোট ছোট অংশ টুকরা জোড়া দিয়ে তৈরি করতে হয় একটি কার্পেট। কর্মীদের দিয়ে ওই অংশগুলো তৈরি করিয়ে নেন তিনি। কে কতগুলো টুকরো তৈরি করলো, সেই অনুযায়ী তাদের টাকা দেওয়া হয়।

তিনি জানান, ৩০০ সেন্টিমিটার বাই ২০০ সেন্টিমিটার আকৃতির একটি কার্পেটের জন্য ১০৮টি ছোট অংশ তৈরি করা হয় প্রতিটি ৭৩ টাকা দরে, ৯০টি ছোট চার কোনা তৈরি করা হয় প্রতিটি ২৬ টাকা দরে, ৩০টি তিন কোনা তৈরি করা হয় প্রতিটি ১৫ টাকা দরে এবং ৭টি পাঁচ কোনা তৈরি করা হয় প্রতিটি ৫০ টাকা দরে। এগুলো সংগ্রহ করার পর শেষের অংশ দুইটি সেলাই করা হয় ২০০ টাকা দরে। তারপর রঙ করে গ্রাহককে সরবরাহ করতে হয়। গীতা মন্ডলের কর্মীরা যে যতগুলো অংশ তৈরি করেন, তিনি ততগুলোর টাকা পান।

গীতা মন্ডল আরও জানান, শুধু কার্পেট নয়, পাট দিয়ে তৈরি করা হয় ঘরের আড়ায় টাঙানো সিঁকে ও তার ভেতরের বাক্স, পাখি, মাছ, মেয়েদের ব্যবহৃত হাত ব্যাগ, বালতি, ফুলদানি ইত্যাদি। যখন যে কাজের অর্ডার আসে, তখন সেই কাজ করেন তিনি। সময়-সুযোগ হলে কিছু কিছু পণ্য বাড়তিও তৈরি করে রাখা হয়। প্রতিদিনের অবসরে এ কাজ করে একেকজন কর্মী প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান তিনি।
খ্রিস্টান মিশন পল্লির ড্যানিয়েল মন্টুর স্ত্রী মহিলা সমিতির সম্পাদিকা বুলবুলি (৬৫) জানান, ১৯৭৬ সাল থেকে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার খ্রিস্টান মিশনারির মাধ্যমে এ কাজগুলো করানো হয়। গ্রাহকদের চাহিদামতো বিভিন্ন রকম কাজ করতে হয়। এ কাজে প্রয়োজনীয় শুকনো পাট ফরিদপুর, গোপলগঞ্জ ও খুলনা থেকে সংগ্রহ করা হয়। পাটের দর পড়ে কেজি প্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ব্যাচে ৫০ জন নারী-পুরুষ এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এসব সামগ্রী দেশে চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও যায় বলে তিনি জানান।
কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মনির উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, ১৯৭৬ সাল থেকে এই উদ্যোগ চলে আসছে মিশন পল্লিতে। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই হস্তশিল্পের কোনো বিকাশ হয়নি। সরকারি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও নারী-পুরুষকে এ কাজে যুক্ত করতে পারলে স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হতে পারে।
সারাবাংলা/এমএইচ/টিআর