Thursday 14 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বাঁশ ব্যবসার হালনাগাদ, শহরেও ব্যাপক ব্যবহার


১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৯:৩৪ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০১৮ ১৭:৫০
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মেসবাহ শিমুল, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট

ঢাকা: বাঁশ। শহর কিংবা গ্রাম, সবখানে ব্যাপকভাবে উচ্চারিত একটি শব্দ। গাঁও গ্রামে ঘরবাড়ি হয়, ক্ষেতের বেড়া, লাউয়ের মাচান কতকিছুতে বাঁশের ব্যবহার। শহরে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে করপোরেট অফিস, কোথায় নেই বাঁশের ব্যবহার!

কথায় কথায় বাঁশ শব্দের একটি নেতিবাচক ব্যবহার আছে বটে, কিন্তু সত্যিকারে কাজে লাগে বাঁশ, এমনটাই সত্য।

ওগাঁর বাঁশ দশটা টাকায়, সে-গাঁয় টাকায় তেরো,

মধ্যে আছে জলীর বিল কিইবা তাহে গেরো

পল্লীকবির জসীম উদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠের বিয়োগান্তক প্রেমকাহিনীতে বাঁশের বাণিজ্যিক হিসাব নিকাশ এভাবেই ফুঁটে উঠেছে। কিন্তু সেতো গ্রাম গাঁয়ে। শহরে বাঁশের ব্যবহার কতটুকু সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

বিজ্ঞাপন

নাগরিক জীবনেও যে বাঁশের চাহিদা একদমই কম নয় তা বুঝতে হলে আপনাকে যেতে হবে রাজধানীর বাঁশের হাটগুলোয়। যেখানে বছরের বারো মাসই বিক্রি হয় নানা প্রজাতির বাঁশ।

‘মোল্লা-বাড়ির বাঁশ ভাল, তার ফাঁপগুলি নয় বড়;

খাঁ-বাড়ির বাঁশ ঢোলা ঢোলা, করছে কড়মড়।

সর্ব্বশেষে পছন্দ হয় খাঁ-বাড়ির বাঁশ:

ফাঁপগুলি তার কাঠের মত, চেকন-চোকন আঁশ’।

পল্লী কবির সে কবিতাতেই হরেক বাঁশের পরিচয় পাওয়া যায়।

ঝড়ে ভেঙে যাওয়া ঘর মেরামতের জন্য মহাকাব্যের নায়ক রূপাই ওগাঁও থেকে বাঁশ কিনেন। গ্রাম ভেদে টাকায় দশ থেকে তেরোটি বাঁশ বিক্রি হতো তখন। কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে অনেক। সেই বাঁশ এখন রাজধানীতে বিক্রি হচ্ছে একটি বিক্রি হচ্ছে দেড়শো থেকে তিনশ টাকায়।

১৯২৯ সালে জসীম উদ্দীনের সেই হিসাবে টায় ১০টি বাঁশ মিললে একেকটির দাম ছিলো ১০ পয়সা। সে হিসাবে ৮৯ বছরে প্রতিটি বাশের দাম বেড়েছে ২৯০৯৯০%।

রাজধানীতে বাঁশ বিক্রি হচ্ছে শনির আখড়া, সাইনবোর্ড, মেরুল বাড্ডা, নতুন বাজার, উত্তরা, কল্যাণপুরসহ বেশ কয়েকটি স্থানে। বছরের বারো মাসই এসব বাজারে আসছে বাঁশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, বগুড়া, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বাঁশের সিংহভাগই ব্যবহৃত হচ্ছে নির্মাণখাতে।

রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে মেরুল বাড্ডার শুরু। সড়কের পূর্বপাশের বেশ খানিক জায়গাজুড়ে চোখে পড়ে বাঁশের বাজার। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এখানে বাঁশের ব্যবসা করেন হাজী মো. মিজানুর রহমান।

তার মালিকানাধীন মেসার্স ডলি এন্টারপ্রাইজ নামের দোকানের ম্যানেজার আব্দুল হামিদ রানা। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশকে এখানে বাঁশের ব্যবসা শুরু করেন তারা। সেই থেকে প্রতিদিনই কেনাবেঁচা হচ্ছে সমান তালে।

মেরুল বাজারে সবমিলে আটটি দোকান। যার প্রত্যেকটিতে বরাক বাঁশ, রেঙ্গুনী বাঁশ ও মুলী বাঁশ পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে কোনো কোনো দোকানে পাওয়া যায় চাটাইসহ বাঁশের তৈরি কিছু জিনিসপত্র।

রানা জানান, এগুলোর দাম আকার ও মান ভেদে দেড়শ থেকে তিনশ টাকার মধ্যে। তবে নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য এ এলাকায় বরাক বাঁশের চাহিদাই বেশি বলে জানালেন তিনি।

পাশের ভাইভাই দোকানের ম্যানেজার আবুল কাশেম বলেন, ‘বাঁশ লাগেনা কোন্ কামে। বাইচ্চা থাকতে বাঁশ আপনি লাগান আর না লাগান মইরা গেলে কিন্তু লাগান লাগবোই। তাই এই ব্যবসা কিন্তু অন্যরহম ব্যবসা। সবার লাগে,‘ অনেকটা কৌতুক আর হাস্যরসে বলা কাশেমের কথাগুলোর মধ্যে আবারো বাঁশের গুরুত্ব বোঝা গেলো।

দূরে একটি নির্মাণাধীন ভবন দেখিয়ে তিনি বললেন, নানা কাজে বাঁশ লাগলেও মূলত বেশি বাঁশ যায় ভবন নির্মাণ কাজে। ছাদ ঢালাইয়ের সময় বাঁশ ছাড়া হয় না। তাই যে এলাকায় ভবন বেশি উঠছে সে এলাকায়ই বলতে পারেন আমাদের কাস্টমার বেশি- বলেন আবুল কাশেম।

এ বিষয়ে কথা হয় রাজধানীর সাইনবোর্ড এলাকার ঠিকাদার সুমন শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার দুইটা সাইটে এখন ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে। সেখানে প্রায় তিন লাখ টাকার বাঁশ লেগেছে। ত্রিশ ফুট একটি বাঁশ দিয়ে তিন টুকরা করা যায়। ভালো বাঁশ হলে তা দুইবার ব্যবহার করা যায়। প্রথমবার ব্যবহারের পর প্রায় অর্ধেক বাঁশ আর ব্যবহার করা যায় না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাহাড়ি বাঁশ চাটাইসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা গেলেও ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হয় বরাক বাঁশ। যার গিরা ঘন, এবং ভেতরে কম ফাঁপা। লম্বায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ ফুট পর্যন্ত বাঁশ পাওয়া যায় রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। যা ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হয়। দূরত্ব ভেদে ৫ টনের একটি ট্রাকে পরিবহন ব্যয় হয়ে থাকে ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা। এক লটে ৫শ’ বাঁশ আনা যায়। দাম পড়ে প্রায় লাখ টাকা। আনুসঙ্গিক খরচ বেশি হওয়ায় লাভ সীমিত হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

তবে এটি নির্বাচনের বছর। এখানে ওখানে গেট, তোরণ, প্যান্ডেল পড়বে। তাতেও বাঁশের থাকবে ব্যাপক ব্যবহার। নির্বাচনের ডামাডোলে বাঁশ ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগার ভালোই থাকে, বরেন এই ব্যবসায়ীরা।

বাঁশের জন্য বিখ্যাত দেশের মধ্য ও উত্তরের জেলাগুলো। সেখানকার কৃষকরা বলছেন, দিনে দিনে কমছে বাঁশের উৎপাদন। পুরনো বাঁশঝাড়গুলোর বাঁশ ধীরে ধীরে শেষ হওয়ার পর আর নতুন করে চাষ হচ্ছে না। সেখানে হয় অন্যকিছুর চাষ হচ্ছে না হয় বসবাসের জন্য ঘর তোলা হচ্ছে।

বিষয়টি মেনে নিচ্ছেন ঢাকার ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, আগে যেভাবে বাঁশের যোগান ছিলো এখন তা কমেছে। অবশ্য চাহিদাও কমেছে অনেক। কেননা বস্তি এলাকা কমে যাওয়ায় বাঁশের ব্যবহার কমেছে শহর এলাকায়।

এ বিষয়ে ডলি এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী হাজী মিজানুর রহমান বলেন, প্রথম জীবনে এই ব্যবসা শুরু করি। এখন আরোকিছু নিয়ে কাজ করছি। তবে বাঁশের ব্যবসা আছে, থাকবে। লাভ কম বেশি এটা ব্যবসার ধর্ম। তাই বলে পূরণো ব্যবসাতো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

তবে ব্যবসা যতই হোক, যারা বাড়ি বানাতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করছেন, তাদেরকে কিন্তু মোটেই পছন্দ নয় এই বাঁশ ব্যবসায়ীদের।

সারাবাংলা/এমএস/এমএম