Thursday 14 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দক্ষিণের সুখ-অসুখ: হারিয়েছে রবিশস্য ফুরিয়েছে জ্বালানিও


১৫ মার্চ ২০১৮ ১৫:২৪ | আপডেট: ৫ নভেম্বর ২০১৮ ২০:০৬
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

।। মেসবাহ শিমুল, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

পিরোজপুর ও বাগেরহাট থেকে ফিরে: পিরোজপুরের বানিয়ারী গ্রামের মাটির রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে যে বাড়িগুলো চোখে পড়ে তার বেশিরভাগই নিম্ন-মধ্যবিত্তের। মাটির মেঝের ওপর কাঠের ঘর, টিনের চাল। কোনো কোনো বাড়ি ইটের পাকা ভবনও চোখে পড়ে। তবে সবগুলো বাড়ির উঠোন, আনাচে-কানাচে একটি জিনিসের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তা হলো ‘মুঠে’। গরুর গোবর দিয়ে তৈরি এক ধরনের  জ্বালানি। ফাল্গুনের তপ্ত রোদে শুকিয়ে যেগুলো সংরক্ষণ করে রাখছেন গৃহিণীরা।  বর্ষা মৌসুমে এগুলোই হবে এ এলাকার মানুষের জ্বালানির অন্যতম উপকরণ।

কেবল বানিয়ারীই নয়, দক্ষিণের বিশাল এলাকার গ্রামে গ্রামে এই মুঠের রয়েছে বিশেষ চাহিদা। কোনো কোনো পরিবারে এটি আর্থিক উপার্জনেরও মাধ্যম। এলাকা ভেদে এক শ’ মুঠে বিক্রি হয় দুই থেকে তিন শ’ টাকা। অথচ মাত্র এক দশক আগেও এমনটি ছিল না। তখন এ এলাকার মাঠগুলো ছিল রবিশস্যের বিশাল ভাণ্ডার। বৈচিত্র্যে ভরা ফসলের মাঠে কৃষক যেমন সারা বছর ধরে অর্থকরী ফসল পেত তেমনি তার উচ্ছিষ্ট হতো জ্বালানি। যা দিয়ে সারা বছরই একটি গৃহস্থ প্রয়োজন মেটাতে পারত। অথচ এখন রান্না ঘরের মাচায় জ্বালানির আকাল। উঠোনের কোণে নেই খড়-বিচালীর গাদা।

বিজ্ঞাপন

রান্নার জ্বালানির যোগান দিতে এ অঞ্চলের পরিবারগুলো এখন বড়-গাছপালার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। গাছের ডাল কাটতে গিয়ে অনেক পরিবার শিরিষ, চম্বল,মেহগনিসহ দামি গাছগুলো কেটে ফেলছেন কখনো কখনো। এ ছাড়া সিলিন্ডারগ্যাস প্রাপ্তি সহজ হয়ে যাওয়ায় প্রায়ই বাড়িতেই রয়েছে গ্যাসের চুলা। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর বাজারেও দোকানে দোকানে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই চোখে পড়ে।

ঢাকা থেকে বাসে দক্ষিণ বঙ্গে যেতে ফরিদপুর কিংবা গোপালগঞ্জের যে বিলগুলো চোখে পড়ে তার প্রায় সবগুলোই এখনও রবিশস্যের বিশাল ভাণ্ডার। গাড়ির জানালা না খুললেও নাকে এসে লাগে ফসলের গা ছুঁয়ে আসা মিষ্টি সুবাস। বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। আজ থেকে ক’বছর আগেও এমন অবস্থা ছিল পিরোজপুর ও বাগেরহাটের মাঠগুলোতেও। বারো মাসে তের ফসলের দেশ খ্যাত এ অঞ্চলে রবিশস্যই ছিল কৃষকের মুখের হাসি। জমি-জিরেত রয়েছে এমন গৃহস্থগুলো বাজার থেকে কেবল লবণ আর পোশাক-আশাক কিনত। মাছ-তরকারি কেনা লাগত কালেভদ্রে। তবে সে সবই আজ কেবলই অতীত। মাঠগুলো এখন ধানের দখলে। যে জমিতে নানা জাতের ডাল, তিল-সরিষা কিংবা পেঁয়াজ-মরিচের আবাদ হতো সে জমিতে এখন আবাদ হচ্ছে হাইব্রিড ধান। যার কোনো কোনো জাত লবণাক্ত পানিতেও চাষ যোগ্য।

এ বিষয়ে রঘুনাথপুর গ্রামের মাস্টার মোস্তাবশির রহমান বশির জানান, রবিশস্য আবাদ করে এক সময় আমরা সারাবছরই পরিবারের অর্থের যোগান দিতাম। প্রয়োজন মতো সেগুলো বিক্রি করতাম। বাজার কেন্দ্রিক নির্ভরতা কম ছিল। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সঠিক সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না, আবার যখন হচ্ছে তখন এক নাগাড়ে হচ্ছে এতে করে রবিশস্য আবাদ করা যাচ্ছে না। লবণ পানির প্রকোপ তো আছেই। সবমিলে রবিশস্যের আবাদ কমেছে। আমরা এখন  ধান চাষ করছি। ধান চাষে খরচ বাড়লেও কিছু করার নেই।

সামন্তগাঁতী গ্রামের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে বলেশ্বরের একটি শাখা খাল। ছোট্ট খালটির দু’পাশে কয়েক বছর আগেও রবিশস্য আবাদ হতো। শীত মৌসুমে সরিষার হলুদ রং যেন আবির ছড়াত হিন্দু অধ্যুষিত এ এলাকায়। রোজ বিকেলে কিষাণীরা ফসল তোলা কিংবা পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত থাকত। পুরো মৌসুমজুড়ে সামন্তগাঁতীর ঘরে ঘরে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকত। তবে গেল ক’বছরে সামন্তগাঁতী গ্রামের চেহারা বদলে গেছে। যে মাঠে রবিশস্যের আধিক্য থাকত সেখানে আজ তা একেবারেই নেই বললে চলে।

এ গ্রামের প্রবীণ কৃষক খগেন মণ্ডল জানান, এক সময় মাঠে ডালসহ হরেক রকম ফসলের আবাদ হতো। টমেটো, তরমুজ, বাঙ্গীসহ অন্যান্য সবজিও হতো মাঠগুলোতে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সে আবাদ উঠে গেছে। এখন আমরা বিএডিসির সহায়তায় ধান চাষ করছি।

কৃষি বিভাগের সহায়তায় গত ক’বছর ধরে কেবল সামন্তগাঁতী গ্রামেই নয়, এ এলাকার প্রতিটি গ্রামেই বোরো চাষ হচ্ছে। বলেশ্বর যখন প্রবহমাণ ছিল তখন জোয়ার ভাটার সঙ্গে এ এলাকার সেচ ব্যবস্থা নির্ভর করলেও এখন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসির ব্যবস্থাপনায় নদীর পানি কিংবা কোথাও কোথাও ভুগর্ভস্থ পানি দিয়ে ব্যাপকভাবে বোরো চাষ চলছে। এতে করে ধান উৎপাদন বাড়লেও কমেছে নানা পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় রবিশস্যের আবাদ।

এ বিষয়ে এ এলাকার বিএডিসির ফিল্ড সুপারভাইজার শিপন হালদার বলেন, ‘গত দু’বছর ধরে বোরো মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধায় সহায়তা করছেন তিনি। এ জন্য বিঘাপ্রতি (৮০ শতক) কৃষকদের কাছ থেকে এক মৌসুমে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়।’

রবিশস্যের এমন আকাল কেবল সামন্তগাঁতী কিংবা বানিয়ারী গ্রামেই নয়। তারাবুনিয়া, বরইবুনিয়া, হোগলাবুনিয়া, মাহমুদকান্দা, মাটিভাংগা, চরমাটিভাংগা, বইবুনিয়া, ভাইজোড়া, বাঘাজোড়া, শিংখালী, মালিখালী, সাচিয়া, বুড়িখালী, চালিতাবাড়ী, রুহিতলাবুনিয়া, কুমারখালী, কবিরাজবাড়ী, আমতলা, আদাজুড়ী, আমতলা, অতুলনগরসহ পিরোজপুর ও বাগেরহাটের বেশিরভাগ এলাকায়। স্থানীয় কৃষকদের ভাষায় ‘কৃষির সুদিন মরে গেছে’। এখন কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে ক্ষেতে ধান ফলাই। পরিশ্রম করি কিন্তু আগের মতো ফসল দেখে ‍মুখে হাসি আসে না। কলিজা ভরে না।

কৃষি ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার কারণে দক্ষিণের কৃষিতে যেমন পরিবর্তন এসেছে। তেমনি তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে গবাদিপশু পালন ব্যবস্থায়ও। আগে যে মাঠে মাঠে গরু-ছাগল চরত এখন সেখানে শীতকালে ধান চাষ হওয়ায় গৃহস্থগুলো পশুপালন সীমিত করে নিয়ে এসেছেন। কৃষিতে যান্ত্রিক ব্যবস্থা শুরু হওয়ায় হালের বলদের প্রয়োজন পড়ছে না। তাই যারা গরু পালন করছেন তারা বাড়িতে রেখে খড়কুটা আর বাজারের কেনা গো-খাদ্য খাওয়াচ্ছেন। এতে করে খরচ বাড়ছে।

এদিকে পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বলেশ্বরের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিতে পরিবর্তনের বিষয়টিকে কৃষিবিদরা বলছেন, স্বাভাবিক নিয়তি হিসেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় রবিশস্যের বিপরীতে আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী ধান চাষের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। যদিও পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের কৃষি বিভাগ এমন উদ্যোগের বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোহসীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে সরকারের পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এক্ষেত্রে মাটি ও পানি বিবেচনায় নতুন নতুন উচ্চ ফলনশীল ধানকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।’ এ অঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হাইব্রিড ফসলের দিকেই কৃষি অধিদফতরের বর্তমান প্রাধান্য বলে এ সময় তিনি জানান।

এ কৃষি কর্মকর্তার কথার সত্যতা পাওয়া গেলো বুড়িখালী গ্রামে। সেখানকার মাঠে উচ্চ ফলনশীল এসিআই-২ জাতের ধান চাষ করেছেন কৃষক কামাল হোসেন। তিনি জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে এবারই প্রথম এ ধানের চাষ করেছেন তিনি। বিঘায় এক শ’ মন ধান উৎপাদন হবে বলে জানান তিনি। কামাল বলেন, ‘অন্যান্য ধানের চেয়ে ৫ থেকে ৭ দিন আগেই ধান ঘরে উঠবে বলে কৃষি অফিস জানিয়েছে।’

জীবপরিবেশবিদরা বলছেন, বলেশ্বরের পানি প্রাকৃতিকভাবে পরিবর্তন হওয়ায় কেবল উপরের কৃষিই নয় নদীর পানি এবং নদী তীরের জীববৈচিত্র্যেও নেতিবাচক পরিবর্তন আসছে। নদীর মাছ, ছোট ছোট প্রাণী, পাখিরা হুমকির মুখে পড়েছে। অভিযোজনে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকে আবাস পরিবর্তন করছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, ‘বলেশ্বর নদী নিয়ে পরিবেশবাদীরাও উদ্বিগ্ন। জমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষিতে পরিবর্তন আসছে। যা এ এলাকার মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনছে। অথচ সামান্য কিছু জায়গা ড্রেজিং করা হলে পুরো বলেশ্বর নদী আবারও স্বাভাবিক হতে পারে বলে মনে করেন এ পরিবেশ আন্দোলনকর্মী।

দক্ষিণের সুখ-অসুখ: বদলেছে অর্থনীতি, বদলে গেছে মানুষ
দক্ষিণের সুখ-অসুখ: এখানে নদী মরে লোভ আর নির্যাতনে
দক্ষিণের সুখ-অসুখ: খাবার পানি নিয়ে বাড়ছে কলহ-বিভেদ!

সারাবাংলা/এমএস/আইজেকে/এমএম