এমদাদুল হক তুহিন, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
একসময় ফেরি করে হাঁড়িপাতিল বিক্রি করতেন লৌহজংয়ের পশ্চিম শিশুলিয়ার বাসিন্দা ইদ্রিস বেপারী (৫৫)। দিনের আয় দেড়শ’ দুইশ’ টাকার বেশি হতো না। এখন তিনি মাওয়ার শিশুলিয়া নতুন ঘাটের ফলব্যবসায়ী। দিনে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। এতে ৪ থেকে ৫’শ টাকা লাভ থাকছে। আগের চেয়ে আয় বেড়েছে। নির্মাণাধীন পদ্মাসেতুর কারণেই যে এই বাড়তি আয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত ইদ্রিস বেপারী।
কেবল নতুন বানানো এই শিমুলিয়া ঘাটের কারণে নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে অন্তত ২০০ দোকানীর। তবে অনেকেই রয়েছেন মা্ওয়ার পুরাতন ঘাটের বিক্রেতা। যারা এখানে তাদের নতুন দোকান তুলেছেন তাদের একজন ইদ্রিস। নতুন ব্যবসা নিয়ে বসেছেন প্রবাস ফেরত মো. জাহাঙ্গীরও। বছর দুই আগে তিনি পারি জমিয়েছিলন মধ্যপ্রাচ্যের ওমানে। তবে স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে হোঁচট খেয়ে দেশে ফিরে নতুন স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছেন ফলের ব্যবসা। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দিনে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার ফল বিক্রি হচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে অন্তত লাভ থাকছে ৫০০ টাকা। বিক্রি বেশি হলে কখনও লাভের অঙ্ক এক হাজারও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।’
দেশের সর্ববৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প স্বপ্নের পদ্মাসেতুকে ঘিরে মাওয়া ঘাটের ইদ্রিস ও জাহাঙ্গীরই নয়, স্বচ্ছলতা ফিরেছে একই ঘাটের লঞ্চ মালিকদেরও। শিমুলিয়া নতুন ঘাটে এমএলফোর ম্যান নামক লঞ্চের মালিক মো. ফারুক হাওলাদারের সঙ্গে কথা হলে সারাংলাকে তিনি বলেন, এখন আগের চেয়ে যাত্রী ও আয় বেড়েছে ২০ শতাংশ।
নতুন এই ঘাট থেকে ৮৭ টি লঞ্চ চলাচল করে জানিয়ে ফারুক বলেন, ‘ঘাট যখন ছিল না, তখন এটা বালুর মাঠ ছিল। ঘাট স্থানান্তরিত হওয়ার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। তবে বেশিরভাগ লোকই আগের ঘাট থেকে এখানে এসেছেন।’
পদ্মাসেতু চালু হলে এই লঞ্চগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে এমনটাই ভাবছেন মালিকরা। তবে সে জন্য অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। অনেকেই মনে করছেন তখন এই এলাকা, তথা নদী পযর্টন কেন্দ্রে পরিণত হবে, যাতে তাদের আয় কমবে না, বরং বাড়বে। বিকল্প কর্মসংস্থানে সরকারের সহায়তাও চাইছেন কেউ কেউ।
মাওয়া অংশে প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তরে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন কুমারভোগের বাসিন্দা আবুল কালাম (৫৮)। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখানে ২ বছর ধরে কাজ করছি। সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে বেতন পাচ্ছি। কোন রকমে চলে যাচ্ছে। তবে আগের চেয়ে ভালো আছি।’
শুধু পদ্মাপাড়ের মানুষ নন, সেতু নির্মাণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছে দেশের নানা প্রান্তের মানুষ। প্রকল্পের ভেতরে কাজ শেষে দুপুরে দল বেঁধে নদীতে গোসল করছিলেন রানা ও আকাশ। তারা বগুড়া থেকে এসেছেন। রানা জানান, এলাকায় ইট ভাঙার কাজ করতেন, এখন কোম্পানির হয়ে যখন যে কাজ তাই করছেন। এতে মাসে সাড়ে ৯ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন। আর এইচএসসি পাসের পর পারিবারিক অস্বচ্ছলতায় পদ্মাসেতুর কাজে জড়িয়ে যাওয়া আকাশের বেতন সাড়ে ৭ হাজার টাকা। কাজ পেয়ে আকাশ ও রানার মতে অন্যরাও সাময়িক সময়ের জন্য সন্তুষ্ট।
পদ্মাসেতুর কর্মযজ্ঞ ঘিরে অর্থনৈতিক সচলতা শুধু মাওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এপাড়ে তা বিস্তৃত হয়েছে ঢাকা পর্যন্ত। চারলেন রাস্তা নির্মাণের প্রভাব পড়েছে আশেপাশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও। পোস্তগলা ব্রিজ পেরিয়ে একটু সামনে যাওয়ার পর থেকেই চোখে পড়তে লাগলো চারলেন বিশিষ্ট নতুন রাস্তা নির্মাণের কাজ। দেখা গেছে, কোথাও কোথাও বালি দিয়ে বরাদ্দ চলছে। আবার কোথাও ফেলে রাখা বালি সমান করা হচ্ছে। কোন কোন স্থানে রড, সুড়কি দিয়েও কাজ চলছে। সতকর্তার স্বার্থে সবার মাথায় রয়েছে হেলমেট। আর স্থানে স্থানে ‘নিরপত্তাই প্রথম’ খচিত ফলকও শোভা পাচ্ছে। আর গাড়িতে বসেই সেনাবাহিনীর তদারকিও লক্ষ্য করা গেছে। রাস্তার দুই ধারে কয়েক শ’ শ্রমিক কর্মরত।
পথে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর ইসলাম ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘রাস্তার কাজ চলায় সেনাবাহিনীর তদারকির গাড়িগুলোও ফুয়েল নিচ্ছে। এতে আগের চেয়ে অন্তত ৫০ হাজার টাকা বিক্রি বেড়েছে।’
স্বপ্নের পদ্মাসেতুকে ঘিরে চারলেন রাস্তা নির্মাণের যে মহাকর্মযজ্ঞ চলছে, তার প্রভাব পড়েছে এই ফিলিং স্টেশনটিতে। শনিবার সকালে ওই স্টেশনটিতে কথা হওয়ার সময় বাচ্চু মিয়া ছাড়াও একই রকম তথ্য জানান এক বিক্রয় প্রতিনিধিও। ঠিক সেখানেই কথা হচ্ছিল স্থানীয় এক বাসিন্দার সঙ্গে। ‘স্থানীয়’ নাকি প্রশ্ন করা হলে তার উত্তর ছিল- ‘জমি কিনবেন নাকি?’
খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এখানে জমির দাম এখন বেশ চড়া। রাস্তার আশেপাশে সব জমি বেঁচা এখন শেষ। এখন দূরের জমিও বিক্রি হচ্ছে চড়া দরে।
পদ্মাসেতুর নির্মাণযজ্ঞ ঘিরে জাজিরা প্রান্তে উন্নয়নের ছোঁয়া আরও বেশি। জাজিরা প্রান্তের মাঝির ঘাটে কথা হয় শরিয়তপুর জেলা মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি কাজী ওসমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন হয়েছে তা হচ্ছে, মানুষের মনোজগতে এর প্রভাব পড়েছে।’
এছাড়া ২২ কি.মি নতুন রাস্তা হওয়ায় যাতায়ত সুবিধাও বেড়েছে,’ বলেন তিনি।
কাজ শুরুর প্রথম দিকেই মাঝির ঘাটে নতুন করে পাড় নির্মাণ করা হয়েছে জানিয়ে স্থায়ী দোকানি ওহাব আলী শেখ বলেন, ‘যখন প্রকল্পের কাজ চলছিল, তখন বিক্রি অনেক বেড়েছিল। এ প্রান্তে শ্রমিকদের কাজ শেষ হওয়ায় বিক্রি কিছুটা কম, তবে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’
নদীর পাড়ের ওই সবজি দোকানে দাঁড়িয়েই কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে এ এলাকার মানুষ রোজ আনতো, রোজ খাইত। সব কিছু মিলতো না। এখন এমন কোন জিনিষি নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না।’
মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আরও জানালেন কর্মসংস্থানে রাজধানীতে চলে গিয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন এলাকায় ফিরে গিয়ে কাজ কিংবা ব্যবসা করছেন। ধীরে ধীরে এলাকায় কিছু কিছু ছোট ছোট শিল্পও গড়ে উঠছে বলে জানালেন তিনি।
ঘাটটির মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডে চায়ের দোকান মাহবুবের। সেখানে ৪ বছর ধরে ব্যবসা করছেন জানিয়ে বলেন, ‘আগের চেয়ে কিছু বিক্রি অনেক বেড়েছে।’
এদিকে, পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যান ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যামার দিয়ে মহাকর্মযজ্ঞ চলা অংশে, অর্থাৎ দৃশ্যমান হওয়া পদ্মাসেতুর পদ্মাপাড়ে কথা হয় মাদারীপুরের কাঠালবাড়ির বাসিন্দা দেলোয়ার হোসের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘রাত ১০ টা পর্যন্ত এখন এই স্থানে উৎসুক মানুষের ভিড় থাকে। বাইরে থেকে এলাকায় নতুন কেউ আসলে তিনি পদ্মাসেতু না দেখে যান না। সে কারণেও দোকান-পাটে বিক্রি বেড়েছে।
তখন দুপুর প্রায় ৩ টা। দৃশ্যমাণ প্রথম স্প্যান ও বিশ্বের বড় হ্যামার দেখতে পদ্মাপাড়ের ওই স্থানটিতে ১০-১৫ জন দাঁড়িয়েছিলেন। মোটরসাইকেলে করে দূরের এলাকা থেকে এসেছে তারা। সঙ্গে এক শিশুকেও দেখা যায়। আগতদের এসময় মুঠোফোনে ছবি ও সেলফি তুলতে দেখা গেছে।
ঠিক সেখানেই মুড়ি বিক্রি করছিলেন কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা মুসলেম মাতবর। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আগে কৃষি কাজ করতাম। বয়স বেশি হওয়ায় এখনও আর তা করতে পারিনা। এখন এখানে দাঁড়িয়ে দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকার মুড়ি বিক্রি করতে পারছি। এতে ২০০ টাকার মতো থাকছে।’
লোকজন কেমন হয়? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দুপুরে কম থাকে। বিকেলের দিকে পুরো চর জুড়ে মানুষের ভিড় থাকে।’
যে ট্রলারে করে সপ্নের পদ্মসেতু ঘুরে দেখছিলো সারাবাংলা টিম তার মাঝিও বললেন, ‘আপনাদের মতো এখন অনেকেই আসে। নদীর ওই অংশে যেতে চায়। ভাড়া পাই আয়ও বাড়ে।’
সারাবাংলা/এটি/এমএম