স্পেশাল নকরেসপন্ডেন্ট
ঢাকা: রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া প্রশাসন থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। তাই দুর্নীতি রোধে সবার আগে রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। রাজধানীতে এক সেমিনারে এসব কথা বলেছেন বক্তারা।
রোববার দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত ‘জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন ব্যবস্থাপনা: দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের প্রধান নিয়ামক’ শিরোনামের ওই সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন- বিএফইউজের সভাপতি মঞ্জুরল আহসান বুলবুলের সঞ্চালনে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভাসির্টির ট্রেজারার এ জেড এম শফিকুল আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, দুদকের উচিত চিহ্নিত নামকরা দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। আমরা প্রায়ই দেখি দুদক বড় বড় লাঘব বোয়ালদের ডাকছে। কিন্তু পরে এদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়, তা আমরা জানতে পারি না।
জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, দুদকের উচিৎ প্রশাসনের নিয়োগ বাণিজ্য,পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা। পানামা পেপার এবং প্যারাডাইস পেপারে অনেকের নাম এসেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছাড়া দুর্নীতি দমন বা প্রতিরোধ করা কঠিন। ভারতের সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের এবং তার পোষ্যদের সম্পদের উৎসসহ বিবরণি দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের দেশেও তা করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজউদ্দীন খান বলেন, দুর্নীতি দমন করতে হলে জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন থাকতেই হবে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা অনুপস্থিত। জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়তে হলে সরকারি নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, পদায়নে, শৃঙ্খলা এবং পদোন্নতির স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন নীতিমালা প্রয়োজন।
সাবেক মন্ত্রী ড. মিজানুর রহমান শেলী বলেন, মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে, স্কুল থেকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া পুরনো মূল্যবোধ জাগাতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রাণ-ভোমরা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন অসম্ভব।
সুজন সম্পাদক বদিউল মজুমদার বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে দুর্নীতি হয় এবং এর মাধ্যমেই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকরণ হয়ে যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করাও দুর্নীতি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা। এটি অবিলম্বে প্রকাশ করা উচিত।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, যে কোন মূল্যে ঘুষ ও দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশে রুগ্ন রাজনীতি চলছে। এটা আদর্শের রাজনীতি নয়। দেশে লুটপাটের রাজনীতি চলতে থাকলে দুর্নীতি বন্ধ করা যাবে না।
অর্থনীতিবিদ খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে সমাজের উচু স্তরের দুর্নীতিবাজদের দুর্নীতি খুজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ব্যারিস্টার তানিয়া আমির বলেন, দুদকের আচরণ সময় সময় পরিবর্তন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এক রকম, দলীয় সরকারের সময় আরেকরকম। তাই সময় সময় আচরণ পরিবর্তন করা বন্ধ করতে হবে।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, মানিলন্ডারিং আইন ও দুদক আইন সংশোধনের কারণে দুদক অনেক অপরাধের তদন্ত করতে পারছে না। ফলে পানামা পেপার কিংবা প্যারাডাইজ পেপার দুর্নীতিতে যে সকল বেসরকারি ব্যক্তির নাম এসেছে তাদেরকে অনুসন্ধান করা কমিশনের জন্য কিছুটা জটিল বিষয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন , প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপারে কমিশন শুন্য সহিষ্ণুতার নীতি অবলম্বন করবে। কোচিংয়ের আড়ালে ভ্যাট-ট্যাক্সবিহীন উপার্জন অবশ্যই অনুপার্জিত আয়। বাংলাদেশের সংবিধান কাউকে এই অনুপার্জিত আয় ভোগ করার সুযোগ দেয়নি।
সারাবাংলা/ জিএস/এমএস