।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।
ঢাকা: লিভার সিরোসিস ও লিভার ফেইলিউরের রোগী ৫৫ বছর বয়সী সিরাজুল ইসলাম। ওই রোগের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ভুগছিলেন জন্ডিসে। তার রক্তে বিলিরুবিন মাত্রা ১১। প্রচলিত চিকিৎসায় বিলিরুবিন কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছিল না। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেশির থাকায় লিভারের চিকিৎসাও সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু সিরাজুল ইসলামের লিভার ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে চিকিৎসকরা তার জন্ডিস কমিয়ে আনতে পেরেছেন।
আরেক ক্যান্সারাক্রান্ত রোগীর জন্ডিস ছিল পাঁচ দশমিক তিন। কিন্তু তার কেমোথেরাপি বা ক্যান্সারের অন্য চিকিৎসা করতে হলে রিলিবুবিন পাঁচ এর উপরে থাকা যাবে না। এই রোগীর এক সেশন ডায়ালাইসিস দেওয়ার পর বিলিরুবিন নেমে আসে চার দশমিক এক-এ। তারপর শুরু হয় তার ক্যান্সার চিকিৎসা, সাতদিন তিনি ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। এখন রয়েছেন ছুটিতে, একমাস পর তাকে আবার আসতে বলা হয়েছে।
আরেক ক্যান্সারাক্রান্ত রোগীর বিলিরুবিন ছিল ২২। লিভার ডায়ালাইসিসের প্রথম সেশন পর বিলিরুবিন হয় ১৯। এ রোগীকে আরও দুইটি সেশন দেওয়া হবে। যদি বিলিরুবিন পাঁচ এর নিচে নামিয়ে আনা যায় তাহলে ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু হবে।
লিভার ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে এ পর্যন্ত তিনজন রোগীর বিলিরুবিন কমিয়ে এনেছেন বাংলাদেশের আট চিকিৎসক। এ পদ্ধতি কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বেই প্রথম। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সাফল্যের মুকুটে যোগ হলো আরেকটি পালক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাবের (স্বপ্নীল) নেতৃত্বে চিকিৎসক দলে রয়েছেন ডা. আব্দুর রহিম, ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-আলম ডিউ, ডা. আশরাফুল আলম, ডা. ফয়েজ আহমদ খন্দকার, ডা. আহমেদ লুৎফুল মুবিন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগে কর্মরত ডা. আশরাফুল হক এবং ডা. শেখ আনিসুল হক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)- এর নেতৃত্বে একদল লিভার, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন ও হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ক্রনিক লিভার ফেইলিয়রের চিকিৎসায় গত এক বছরের বেশি সময় ধরে স্টেম সেল থেরাপি ব্যবহার করে আসছেন, অতি সম্প্রতি তারা শুরু করেছেন লিভার ডায়ালাইসিস।
স্টেম সেল থেরাপি ও লিভার ডায়ালাইসিস লিভার ক্যান্সার, একিউট লিভার ফেইলিউর বা ক্রনিক লিভার ফেইলিউরের মতো রোগের চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে যা কিনা বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একবারেই নতুন।
কেন এই লিভার ডায়াইসিস দরকার এবং এর প্রয়োজনীয়তা কোথায় জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের এই ডায়ালাইসিসের টার্গেট সব রোগীরা নন। যাদের জন্য একেবারেই প্রাণরক্ষাকারী হবে তাদেরকেই দেওয়া হবে এই ডায়াগনোসিস।’
তিনি বলেন, ‘যেসব কারণে জন্ডিস রোগীর মৃত্যু হতে পারে বা যেসব কারণে জন্ডিসের জন্য চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে যেমন লিভার ক্যান্সারের রোগী তাদের জন্য এ চিকিৎসা পদ্ধতি। একিউট লিভার ফেইলিউর বা ক্রনিক লিভার ফেইলিয়রের রোগী-যাদের জীবন সংশয়ে রয়েছে তাদের জন্য এই চিকিৎসা। কিছু কিছু রোগী রয়েছে যাদের একিউট লিভার ফেইলিয়র ডেভেলপ করে, তাদের জন্ডিস কমানো জরুরি।’
‘স্টেম সেল দিয়ে রোগীকে রিজেনারেট করানো এবং ডায়ালাইসিস দিয়ে বিলিরুবিন কমিয়ে আনা হয়-এটা একটা প্যাকেজ বলতে পারি আমরা’— বলেন এই উদ্ভাবনী চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব। এই ‘বিলিরুবিন ডায়ালাইসিস’ বিশ্বের কোথাও এর আগে করা হয়নি বলেও মন্তব্য তার।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ক্যান্সারাক্রান্ত যে রোগীকে আমরা ডায়ালাইসিস দিয়েছি, জন্ডিসের কারণে তার চিকিৎসাটাই শুরু করা যাচ্ছিল না। কিন্তু ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বিলিরুবিন কমানোর কারণে তা ক্যান্সারের চিকিৎসাটা শুরু করা গেলো-‘ট্রিটমেন্ট টলারেট’ করতে পারলে সে হয়ত একেবারে সুস্থ হয়ে যাবে না, কিন্তু চিকিৎসাটা করানো গেলে কিছুদিন সুস্থ হয়ে যাবে।
প্রসঙ্গত, ভাইরাল হেপাটাইটিসের মত একিউট লিভার কন্ডিশন কিংবা লিভার সিরোসিসের মত ক্রনিক ব্যাধি – এই দুই ধরনের রোগীর বেলাতেই লিভার ফেইলিয়র দেখা দিতে পারে যা কীনা লিভারের সবচাইতে জটিল সমস্যাগুলোর একটি।
চিকিৎসক দলের সদস্য ডা. শেখ মোহাম্মদ নূর-আলম ডিউ সারাবাংলাকে বলেন, লিভার ফেইলিয়রের বেলায় লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশনের ব্যবস্থা থাকলেও সেটি অনেক জটিল প্রক্রিয়া। ট্রান্সপ্ল্যানটেশন করতে হলে আত্মীয়ের মধ্যে একজন ডোনারের প্রয়োজন হয় যা সবসময় সম্ভব নয়। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশনের সুবিধা নেই, পাশাপাশি ভারতেও এই চিকিৎসা যথেষ্ট ব্যয়বহুল। অপরদিকে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে লিভার ডায়ালাইসিসের জন্য প্রমিসি ও মার্স দুই ধরনের ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং একজন রোগীর এতে ডায়ালাইসিস করতে খরচ হয় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা।
কীভাবে এই পদ্ধতি কাজ করে জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, স্টেম সেল থেরাপিতে প্রথমে গ্র্যানুলোসাইট কলোনি স্টিমুলেটিং ফ্যাক্টর (জিসিএসএফ) ইঞ্জেকশন ব্যবহার করে রক্তে স্টেম সেলের সংখ্যা গুনে বাড়ানো হয়। এরপর রক্ত থেকে জিসিএসএফ প্রয়োগের ফলে বেড়ে যাওয়া স্টেম সেলগুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে আলাদা করে নেওয়া হয়, অনেকটা ছেঁকে নেওয়ার মত। এরপর ক্যাথল্যাবে অ্যান্জিওগ্রামের মাধ্যমে ঐ স্টেম সেলগুলো সরাসরি হেপাটিক আর্টারি দিয়ে লিভারে ইনজেক্ট করা হয়।
অপরদিকে যে পদ্ধতিতে লিভার ডায়ালাইসিস শুরু হলো তা শুধু বাংলাদেশেই প্রথম নয় বরং সারা পৃথিবীতেই প্রথম।
এতে কিডনি হেমোডায়ালাইসিসের মতই রোগীর রক্ত থেকে ক্ষতিকারক উপাদান, এক্ষেত্রে বিলিরুবিন রক্ত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশেষ কলামের ছাঁকনির ভেতর দিয়ে রোগীর রক্ত প্রবাহিত করে প্লাজমা থেকে বিলিরুবিন আলাদা করে ফেলা হয়।
অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, উন্নত বিশ্বে যেখানে মার্স ডায়ালাইসিস মেশিনে প্রচুর এলবুমিন ব্যবহার করে ডায়ালাইসিস করা হয় সেখানে এই নতুন পদ্ধতিতে এলবুমিন ব্যবহার না করেই বিলিরুবিন কমানো সম্ভব হয়েছে।
সারাবাংলা/জেএ/একে
** দ্রুত খবর জানতে ও পেতে সারাবাংলার ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে রাখুন: Sarabangla/Facebook