চনপাড়ার মাদকের আস্তানা থাকবে না: নারায়ণগঞ্জের ডিসি
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২৩:৫৭ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০০:০১
ঢাকা: নারায়ানগঞ্জ জেলার রুপগঞ্জ থানার চনপাড়া মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কোনো জেলা প্রশাসক এই চনপাড়া পরিদর্শন করেন না। তবে জেলার নতুন ডিসি সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত জাহিদুল ইসলাম মিঞা ইতোমধ্যে দুইবার চনপাড়া পরিদর্শন করেন। তিনি বলেছেন, চনপাড়ার আর মাদকের আস্তানা থাকবে না।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) চনপাড়ায় একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তিনি এ কথা বলেন।
জানা যায়, মাদকের অভয়ারণ্য খ্যাত চনপাড়ার এলিট ফোর্স র্যাবও হামলার শিকার হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে।
চারদিকে থেকে নদী বেষ্টিত এই চনপাড়ায় দায়িত্ব নেওয়ার পরেই একটি অনুষ্ঠানে গেলে স্থানীয় নব কিশলয় হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজর শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কাছে স্কুল ব্যাগ ও জুতোর আবদার করেছিল। সেই দিন তাদের আবদার মেনে নিয়ে কথা দিয়েছিলেন তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন ব্যাগ ও জুতোর ব্যবস্থা করবেন। সেই কথা অনুযায়ী জেলা প্রশাসক বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) মোট ৭৩৭ জন শিক্ষার্থীর মাঝে নতুন জুতো ও ব্যাগ উপহার দিলেন।
জেলা প্রশাসকের কাছে থেকে উপহার পেয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় নব কিশলয় হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী আছিয়া খাতুন বলেন, ‘মাদকের হাট বলে পরিচিতি পাওয়ায় ইতোপূর্বে এখানে কোনো জেলা প্রশাসক আসেন নাই। কিন্তু নতুন ডিসি স্যার দুই সপ্তাহের মাথায় দুইবার পরিদর্শন করলেন। আমরা এখন অনেক খুশি। আশা করছি স্থায়ীভাবে চনপাড়া থেকে মাদক নির্মূলে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবেন এই ডিসি স্যার।’
সারাদেশে ‘মানবিক ডিসি’ পরিচিত নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা দিন দিন যেন আস্থার শেষ ঠিকানা হয়ে উঠছেন জেলার সকল প্রতিবন্ধীদের কাছে। সরকারি কাজে যত ব্যস্ত থাকুন না কেন, প্রতিবন্ধীদের যেকোনো বিষয় তার কাছে হয়ে উঠে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই তার সব অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, প্রতিবন্ধীদের কোনো ফাইল একদিনও আটকে রাখা যাবে না।
প্রতিবন্ধীদের তরফ থেকে অভিযোগের সত্যতা পেলেই তাৎক্ষণিক কঠোর শাস্তির কথাও প্রকাশ্যেই বলেন প্রতিবন্ধীবান্ধব নারায়ণগঞ্জ জেলার এই অভিভাবক। শুধু তাই না, প্রতিবন্ধীদের যেকোনো আয়োজনে থাকতে পারলে নিজেকে গর্বিতও মনে করেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। প্রতিদিনের ন্যায় আজকেও (বুধবার) একাধিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে দাওয়াত পেলেও প্রতিবন্ধীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় অনির্বাণ ডিজেবল চাইল্ড কেয়ার স্কুল অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণী এবং নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য দেওয়ার সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের জন্য বোঝা নয় বরং তারা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকলের ভালোবাসা এবং সহযোগিতা পেলে তারা দেশের সম্পদে পরিণত হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সময় উপস্থিত ছিলেন পূর্বাচল রাজস্ব সার্কেল (ভূমি) কর্মকর্তা উবায়ূর রহমান শাহেল, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তারিকুল আলম, উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী আকতার হোসেন, জেলা সমাজসেবার উপপরিচালক আসাদুজ্জামান সরদার প্রমুখ।
পুরস্কার বিতরণ শেষে প্রতিবন্ধী শিশুদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী ও হুইলচেয়ার বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক। এর আগে প্রথমে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম নুরুন্নেছা স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরিদর্শন করেন এবং পিঠা উৎসবের উদ্বোধন, পতাকা উত্তোলন, কুজকাওয়াজ পরিদর্শন ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন কক্ষ উদ্বোধন করেন। পরে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানুষ গড়ার কারখানা, যেখানে শুধু পাঠদান নয়, নৈতিক শিক্ষা ও মনুষ্যত্ববোধ গড়ে তোলা জরুরি।’ জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
সবশেষে, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া নব কিশলয় হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজ পরিদর্শন করেন। সেখানে পতাকা উত্তোলন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন ও পুরস্কার বিতরণ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমাজের বাতিঘর, যা আলোকিত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ তিনি মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একই প্রতিষ্ঠানের কমার্স বিভাগে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাত আক্তার বলেন, ‘আমাদের স্কুলের শহিদ মিনার না থাকায় আমরা ভাষা শহিদদের শ্রদ্বা জানাতে পারছিলাম না ২১ ফেব্রুয়ারিতেও। ডিসি স্যার আমাদের এখানে স্থায়ী একটি শহিদ মিনার নির্মাণ করে দিবেন খুব দ্রুতই।’
জেলা প্রশাসক তার বক্ততায় বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের জন্য যা যা দরকার সবই আমরা করব। কিন্তু শর্ত একটাই, এই প্রতিষ্ঠানের পাশের হার শত ভাগে উন্নীত করতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের দেশের যোগ্য নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসাবে যোগদানের পর থেকেই প্রতিবন্ধীদের জন্য একের পর সহায়তার হাত বাড়িয়েই চলছেন ‘মানবিক ডিসি’। দায়িত্ব নেওয়ার দুইদিনের মাথায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কলেজ ছাত্র সোহাগকে পড়াশোনার জন্য স্মার্ট ফোন উপহার দেওয়ার খবরে জেলার শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠনগুলোও তাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একের পর এক হাজির হয় জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলামের কাছে।
তারই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে জেলার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিশুদের মাঝে হুইল চেয়ার ও শিক্ষা সহায়তা উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। উক্ত অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলার ২০জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাঝে হুইল চেয়ার, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে একটি ইলেকট্রিক চেয়ার, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে একটি কৃত্তিম বেইস (পায়ের ডিভাইস), বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে আহত ২জন ছাত্রকে ওয়াকিংস্ট্যান্ড এবং নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলাধীন কিডস ক্যাম্পাস স্কুল অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ও সুইড বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক স্কুলের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মাঝে শিক্ষা সহায়তা উপকরণ বিতরণ করা হয়।
সারাবাংলা/ইউজে/এইচআই
চনপাড়া জাহিদুল ইসলাম মিঞা নারায়ণগঞ্জ মাদকের আস্তানা মানবিক ডিসি