Friday 28 Feb 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

তেল ছাড়া রমজানের সব পণ্যে স্বস্তি

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৮:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৮:১৪

সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় বাজারে এবার রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল। ছবি: সারাবাংলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: রমজান শুরুর মাসখানেক আগ থেকেই চাহিদা বেশি এমন ভোগ্যপণ্যের দাম পাইকারি ও খুচরা বাজারে বেড়ে যাবে- এটাই ছিল এতদিনকার চিত্র। তবে এবার বাজারের সেই রেকর্ড ভেঙে গেছে। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় চট্টগ্রামের পাইকারি ও খুচরা বাজারে এবার রমজানের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল আছে। বরং, পণ্যের দাম অন্যান্য সময়ের চেয়ে কমেছে।

শুধুমাত্র বোতলের সয়াবিন তেলের সংকট মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তবে, বাজারে বোতলের সয়াবিন তেল কম মিললেও দাম বাড়েনি। কিন্তু, খোলা তেলের দাম বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

রমজান শুরুর তিনদিন আগে বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রামে ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ এবং রিয়াজউদ্দিন বাজারে খুচরা দর যাচাই করে এ চিত্র দেখা গেছে।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ছোলা, চিনি, আদা, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, পাম অয়েলের দাম বরং গত মাসের চেয়ে আরও কমেছে। অন্যদিকে গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে খেজুরের দামও কমেছে।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে প্রতিমণ ভালো মানের ছোলার দাম ছিল ৪২০০ টাকা। বৃহস্পতিবার সেই ছোলা বিক্রি হয় ৩৫৮০ থেকে ৩৬০০ টাকায়। মণপ্রতি কমেছে ৬০০ থেকে ৬২০ টাকা। খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে প্রতিকেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৯৫ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। আর রিয়াজউদ্দিন বাজারে খুচরায় ছোলা বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়।

পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাসে শুধু খাতুনগঞ্জে আমদানি করা ছোলা এসেছে ৪০ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি। এছাড়া যেসব দেশ থেকে ছোলা আমদানি করা হয়, এবার সেখানে বুকিং রেটও সস্তায় মিলেছে। ফলে ছোলার দাম পাইকারি ও খুচরায় সস্তায় মিলছে।

বিজ্ঞাপন
পাইকারিতে সবধরনের পেঁয়াজের দাম কেজিতে অন্তত ১৫ টাকা কমেছে। ছবি: সারাবাংলা

পাইকারিতে সবধরনের পেঁয়াজের দাম কেজিতে অন্তত ১৫ টাকা কমেছে। ছবি: সারাবাংলা

খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে মণপ্রতি চিনির দাম অন্তুত ৫০ টাকা কমে ৪২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরায় সাদা চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১২৫ টাকার মধ্যে। লাল চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। পাইকারিতে সবধরনের পেঁয়াজের দাম কেজিতে অন্তত ১৫ টাকা কমেছে। দেশি পেঁয়াজ ৩৭-৩৮ টাকা, ভারতীয় পেঁয়াজ মানভেদে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরায় পেঁয়াজ মানভেদে ৫৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি ও খুচরায় আদা এবং রসুনের দামও কেজিতে অন্তত ২০ টাকা কমেছে। পাইকারিতে ভারতীয় ও দেশি আদা প্রতিকেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মিয়ানমারের আদা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া, রসুন ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরায় বিভিন্ন ধরনের আদা ১০০ থেকে ১১০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রসুন বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকায়।

খাতুনগঞ্জের হামিদউল্লাহ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাজারে এখন পেঁয়াজ, আদা, রসুন- কোনোটার ঘাটতি নেই। প্রচুর সরবরাহ আছে। পাইকারিতে দাম গত মাসের চেয়ে এখন কম আছে।’

পাইকারিতে মসুর, মটর ও চনার ডাল গত মাসের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমেছে। মোটা দানার মসুর ডাল ৯০ থেকে ৯৫ টাকা, চনার ডাল ১১০ থেকে ১২০ টাকা এবং মটরের ডাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। খুচরায় ডালের মধ্যে ছোট মসুরের ডাল ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকা, মোটা মসুরের ডাল ১১০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৩০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৭০ টাকা, খেসারি ডাল ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ভোজ্যতেলের মধ্যে পাম অয়েলের দাম কমেছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির চেয়ে মণপ্রতি পাম অয়েলের দাম অন্তত সাড়ে তিনশ টাকা কমে পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারিতে পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৫৭০০ থেকে ৫৮০০ টাকায়। তবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে এখনও বোতলের সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, কারখানা থেকে তারা সয়াবিন তেলের বোতল পাচ্ছেন না। পরিবেশক কোম্পানিগুলো সরাসরি খুচরায় তেল সরবরাহ করছেন।

খুচরায় বোতলের সয়াবিন তেল প্রতিলিটার ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা, দুই লিটার বোতল ৩৪৮ থেকে ৩৫০ টাকা, ৫ লিটারের বোতল ৮৫০ থেকে ৮৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই হিসাবে দাম সরকার নির্ধারিত দরেই আছে। তবে সরকার প্রতিলিটার খোলা সয়াবিনের দর ১৫৭ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ১৮০ থেকে ১৮২ টাকা দরে।

নগরীর আসকার দিঘীর পাড়ে রাজীব স্টোরের মালিক রিপু নাথ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সয়াবিন তেলের বোতল পাচ্ছি না। খোলা তেলের চাহিদা বেড়েছে। এখন পাইকারিতে খোলা তেল প্রতি লিটারে ৫-৭ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে বলে আমাদের বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

সয়াবিন তেলের দাম সরকার নির্ধারিত দরেই আছে। ছবি: সারাবাংলা

সয়াবিন তেলের দাম সরকার নির্ধারিত দরেই আছে। ছবি: সারাবাংলা

রমজানের আরেকটি বেশি চাহিদাসম্পন্ন পণ্য খেজুরের দামও এবার কম। বাজারে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ রকমের খেজুর পাওয়া যায়। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, গত বছরের চেয়ে এবার বিভিন্ন ধরনের খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।

খেজুরের পাইকারি বাজার ফলমন্ডিতে দেখা গেছে, জাহিদি খেজুর প্রতিকেজি ১৮০ টাকা ও মেডজুল খেজুর ১৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত রমজানে জাহিদি খেজুরের দাম ৫০ টাকা বেশি ছিল। আর মেডজুল খেজুরের দাম কমেছে ১৮০ টাকা। এছাড়া পাইকারিতে প্রতি কেজি দাব্বাস খেজুর ৩০০-৩৬০ টাকা, মাশরুখ ৪০০ টাকা, সাফারি ৬০০ টাকা, সৌদি আরবের আম্বর ৬০০ টাকা, নাকাল ২৮০ টাকা ও ছড়া খেজুর ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আজোয়া ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা, আম্বর ৯০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রিয়াজউদ্দিন বাজারে খুচরায় দাব্বাস খেজুর মানভেদে প্রতি কেজি ৪০০-৪২০ টাকায়, নাকাল ৩২০-৩৫০ টাকা, জাহিদি ২২০-২৫০ টাকা, আজোয়া ১ থেকে ২ হাজার টাকা এবং মেডজুল ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের খেজুর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমত স্টোরের কর্ণধার মো. কামাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে এবার। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। আমদানিতে খরচ কম হওয়ায় বাজারে সস্তায় খেজুর পাওয়া যাচ্ছে।’

শাকসবজি, মাছ-মাংসের দাম স্থিতিশীল

রিয়াজউদ্দিন বাজারে শাকসবজির দর গত তিন মাসের মতো স্থিতিশীল দেখা গেছে। বাজারে মানভেদে আলু প্রতিকেজি ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শীতকালীন কিছু আলু ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁধাকপি, ফুলকপি, মূলা, শিম, টমেটোসহ শীতকালীন সবজি ১৫ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে আছে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে মানভেদে ৩০ টাকার মধ্যে। কাঁচামরিচ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, শসা ৩০, মিষ্টিকুমড়া ৩০, করলা ৪০, মটরশুঁটি ৭০, গাজর ৪০ টাকা, বরবটি ৫০ ও লাউ ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকের মধ্যে লাল শাক, লাউ শাক, মুলা শাক, পালং শাক, কলমি শাক, ডাঁটা শাক ১০ থেকে ২০ টাকা আঁটি দরে বিক্রি হচ্ছে।

ব্রয়লার মুরগি প্রতিকেজি ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগি প্রতিকেজি ৩০০ টাকা, সোনালি হাইব্রিড ২৯০ টাকা, দেশি মুরগি ৫৪০ থেকে ৫৮০ টাকা, লেয়ার লাল মুরগি ৩০০ টাকা এবং সাদা লেয়ার ২৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গরুর মাংস হাড়ছাড়া প্রতিকেজি ৯৫০ টাকা এবং হাড়সহ ৭৫০ থেকে ৭৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খাসির মাংস ১১০০ থেকে ১১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

খুচরা বাজারে চালের দর এখনও চড়া। ছবি: সারাবাংলা

খুচরা বাজারে চালের দর এখনও চড়া। ছবি: সারাবাংলা

ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম আবারও অন্তত ১০ টাকা কমে প্রতি ডজন ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির ডিম প্রতি ডজন ২৪৫ থেকে ২৫০ টাকা, হাঁসের ডিম ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের মধ্যে বাজারে আকারভেদে প্রতিকেজি রুই মাছ ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, কাতলা মাছ ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাবদা ও শিং মাছ ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, বেলে ও আইড় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ট্যাংরা প্রতিকেজি ৬০০ টাকা, শোল মাছ ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাষের কই ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, পাঙ্গাস ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা এবং গলদা চিংড়ি বিক্রি হয়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে।

মুদি পণ্যের মধ্যে খোলা আটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, প্যাকেট আটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, খোলা ময়দা ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বাজারে চালের দর এখনও চড়া রয়ে গেছে। খুচরায় প্রতিকেজি নাজিরশাইল হাফসিদ্ধ মানভেদে ৮৫ ও ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মিনিকেট সরু আতপ চাল মানভেদে ৫৮, ৬৫ ও ৭৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইজাম সিদ্ধ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০ টাকায়। ব্রি-২৮ চাল মানভেদে ৮০ ও ৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্বর্ণা, চায়না ও ইরি মানের মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা চিনিগুঁড়া প্রতিকেজি ১৪০ টাকা এবং কিছুটা উন্নতমানের চিনিগুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়।

সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম

তেল পণ্য রমজান স্বস্তি

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর