ঈদের ছুটিতে পর্যটকের পদচারণায় মুখর কক্সবাজার, জোরদার নিরাপত্তা
২ এপ্রিল ২০২৫ ১২:৫০
কক্সবাজার: ঈদের টানা ছুটির দ্বিতীয় দিনেও লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর সৈকত নগরী কক্সবাজার। ঈদের আনন্দ উপভোগে পর্যটকদের পাশাপাশি সৈকতে ভিড় করছেন স্থানীয়রাও। এদিকে কাঙ্খিত সংখ্যক পর্যটক সমাগম হওয়ায় খুশি হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা। এদিকে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধে সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িরা বলছেন এরই মধ্যে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেলের অন্তত ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। আজ থেকে আশা করা যায় শতভাগ হোটেল কক্ষ বুকিং থাকবে। পর্যটক আগমনের এই ঢল অব্যাহত থাকবে আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত।
ঈদের তৃতীয় দিনে সকালে সমুদ্র সৈকতে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতের সুগন্ধাসহ সবকটি পয়েন্ট লোকে-লোকারণ্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পর্যটকের আনাগোনা। যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই বিস্তৃত বালিয়াড়ি’র সৈকতের কোথাও। তপ্ত রোদেও সৈকতে ভ্রমণ পিপাসু মানুষের মনে আনন্দ-উচ্ছাসের কমতি নেই। সৈকতে ঘুরতে আসা অধিকাংশ পর্যটকের গন্তব্য গোসলে নেমে সাগরের লোনাজলের স্পর্শ নেওয়া। পর্যটকের ঈদ আনন্দের কাছে যেন হার মেনেছে সাগরের উত্তাল ঢেউও। কোলাহলময় যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ কাটাতে ছুটে আসা ভ্রমণ পিপাসুরা বলছেন, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি কক্সবাজার ঘুরতে এসে তারা তৃপ্ত।

সমুদ্রস্নানে নেমেছে পর্যটকরা। ছবি: সারাবাংলা
কক্সবাজার বেড়াতে আসা বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গীতশিল্পী ছন্দা মৌলিক জানান, তিনি প্রথমবার কক্সবাজার এসেছেন। আসার আগে যেভাবে সমুদ্র সৈকতকে কল্পনা করেছেন এই দৃশ্য তার চেয়েও সুন্দর। এবার থেকে তিনি প্রতিবারই এখানে আসবেন। এমন সৌন্দর্য আর মিস করতে চান না।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা নবদম্পতি সাইফুল ইসলাম জানান, এত কাছ থেকে আগে কখনো সমুদ্র দেখেনি। এই দৃশ্য খুবই ভাল লাগছে। এখানে না আসলে বুঝা যাবে না এটি কত সুন্দর। নিরাপত্তাও চমৎকার। তবে বাড়তি চাপের কারণে হোটেল ভাড়া আর খাবারের দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে।
সিলেট থেকে বেড়াতে আসা সাইমা আক্তার জানান, উত্তাল সমুদ্রে গোসল করা ও সাগরকে এত কাছ থেকে স্পর্শ করতে পারা সত্যিই অনেক আনন্দের। এখানে আসলে যে কারো মন ভাল হয়ে যাবে। পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে এসে এখানে কাটানো সময়গুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে।

মানুষের ভিড়ে তিল ধারনের জায়গা নেই সমুদ্র সৈকতে। ছবি: সারাবাংলা
কাঙ্খিত সংখ্যক পর্যটক আসায় খুশি সাগরপাড়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোঁরা ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে বিপুল সংখ্যক পর্যটক সমাগম ঘটেছে। তাদের সেবা নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে পুষিয়ে উঠবে ক্ষতি।
কক্সবাজার বৃহত্তর বিচ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুর রহমান জানান, তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে পর্যটকদের সেবার সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও অনুরোধ রয়েছে অনৈতিক কোনো কিছু প্রত্যাশা না করতে। এতে বেড়াতে আসা পর্যটকরা যেমন বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে ঠিক তেমনি রয়েছে এই নগরীর সুনামও ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা।
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ৩-৪-৫ এপ্রিল এই তিন দিন শতভাগ হোটেল-মোটেল বুকিং থাকবে। সুতরাং কক্সবাজার আসার আগে অনলাইনে বুকিং দিয়ে আসলে ভাল হয়। নয়ত রুম নিতে ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং বেড়াতে আসা পর্যটকদেরও একটু সর্তক থাকতে হবে।’
এদিকে সমুদ্রস্নানে নেমে কোনো পর্যটক যেন বিপদাপন্ন পরিস্থিতিতে না পড়েন সেজন্য সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে লাইফগার্ড সদস্যরা। আর গোসলের জন্য পর্যটকদের নির্দেশনা মেনে সাগরে নামার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
কক্সবাজার সি সেইফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার ওসমান গনি জানান, রমজানে প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে সি সেইফ লাইফ গার্ড আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছে পর্যটকদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে। গোসল করতে নেমে সাগরে ভেসে যাওয়া পর্যটকদের উদ্ধারের জন্য যুক্ত হয়েছে বেশকিছু নতুন বোটসহ সরঞ্জাম। অতি উৎসাহী অনেক পর্যটক তাদের নির্দেশনা শুনতে চান না। এতে পর্যটকরা বিপদে পড়ে।
তিনি সকল পর্যটককে জানাতে চান, লাবণী-সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে লাল-হলুদ পতাকার মাঝখানে গোসল করতে হবে। সেখানে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সি সেইফ লাইফ গার্ডের সদস্যরা অবস্থান করছেন। এ ছাড়া পর্যটকদের সর্তক থাকতে হবে যেন বিপদ সীমায় না যায়।
পর্যটক হয়রানি রোধে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ ও জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (এডিআইজি) আপেল মাহমুদ জানান, বিপুল সংখ্যক পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিতে ৩ স্থরের নিরাপত্তায় টহল জোরদার করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দায়িত্ব পালন করছে। রয়েছে সাদা পোশাকের টিম। হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়াসহ নেওয়া হয়েছে নানা নতুন পদক্ষেপ।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছবি: সারাবাংলা
হোটেল-রেস্তুরায় বাড়তি দাম রাখলে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। যানজট নিরসন ছাড়াও কেউ পর্যটক হয়রানী করলে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। সবার প্রচেষ্টা একটাই, পর্যটকরা যেন নিরাপদ ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফিরতে পারে।
কক্সবাজার শহরে থাকা সাড়ে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউসে পর্যটক ধারণ ক্ষমতা দেড় লাখের বেশী। সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের পাথুরে সৈকত, শহরের বার্মিজ মার্কেট, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারী পার্ক এবং রামুর বৌদ্ধ বিহারসহ কক্সবাজারের বিনোদন কেন্দ্রগুলো পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে।
সারাবাংলা/এমপি