বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়কের নাম। দেশপ্রেম ও দূরদর্শী চিন্তা তাকে অন্য শাসকদের থেকে আলাদা করেছে। সামরিক শাসক থেকে দেশের জনপ্রিয় নেতা হওয়া এতটা সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু তার বহুমাত্রিক গুণাবলী ও উন্নয়ন মূলক রাষ্ট্রচিন্তা অল্গ সময়ে জনগনের আস্থা অর্জন করতে সহায়তা করে। ফলে সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে সামরিক বাহিনী থেকে রাজনীতিতে আসা তার মতো এতো জনপ্রিয় নেতা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। আজ তার জন্মদিন পালন করছে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো।
আমার কাছে জন্মদিন কেবলই আনুষ্ঠানিক স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং তার রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হতে দিকনির্দেশনা এবং ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে তার অবদান পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও বটে। মহান মুক্তি যুদ্ধে ভূমিকা, স্বাধীনতা -পরবর্তী সংকটময় সময়ে তার সাহসীকতা এবং দেশ ও জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নয়নে তিনি যে নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তার প্রভাব আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়ন আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, শিল্প-করকারখানা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ উন্নয়ন, অর্থনীতি, বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদেশ নীতি, খালকাটা কর্মসূচী, পোশাক শিল্প সহ প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল দেশের উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু তার বিরোধীরা তার নেওয়া নীতি ও শাসন ব্যবস্থা নিয়ে নানা ভাবে সমালোচনা করলেও দূর্নীতি মুক্ত জীবন, ব্যক্তি জীবনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, দেশপ্রেম ও সাদামাটা জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। দেশের অর্থনীতি মোটাদাগে কৃষি, পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্সের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যার সূচনা হয়েছিল জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। একজন রাষ্ট্র প্রধান কতটা দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারে তা বুঝতে তার নেওয়া উদ্যোগ ও চিন্তাগুলো মূল্যায়ন করলে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে। তার রাষ্ট্র চিন্তা ও পরিকল্পনাগুলো এখনো সমসাময়িক বাস্তবতায় কতটা প্রাসঙ্গিক তা গবেষণার দাবি রাখে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষি কাজের সাথে জড়িত। জিয়াউর রহমান তার শাসনামলে কৃষি অর্থনৈতিকে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে নানা পদক্ষেপ হাতে নেন। তিনি খালকাটা কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন। এতে একদিকে প্রাকৃতিক পানির রিজার্ভ বৃদ্ধি পাই, অন্য দিকে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমে যায়। কৃষক কম খরচে এই পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করতে পারেন। একই সাথে মৎস্য উৎপাদনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। আবার, এটা ছিল পরিবেশ বান্ধব যা আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেনি। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষকদের লাভবান করতে সার, সেচ ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করেন। কৃষিতে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছিল তার আমলেই। এতে, তার শাসনামলে ধানের বাম্পার ফলন হয় এবং প্রথম চাল রপ্তানি করা হয়। কৃষি ও কৃষকদের সহায়তা করতে ১৯৭৭ সালে ১০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। গ্রামীণ এলাকার অবকাঠামো ও কৃষি সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১৯৭৭ সালের জিয়াউর রহমান পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাই। যা তাদের কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস করে৷ একই সাথে লেখাপড়া, কর্মসংস্থান ও কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। এছাড়াও তিনি ১৯৭৮ সালে শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ, যুব মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা; ১৯৮১ সালে যুব উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষির উন্নয়নে এই সময়োপযোগী পদক্ষেপগুলো গ্রামীণ উন্নয়ন ও আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-২০২৫ অনুসারে, জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১১.১৯%। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপগুলো কৃষি ও পরিবেশের উপর ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছির বলেই জিডিপিতে কৃষি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারছে। তার কৃষিবান্ধব কাজ আজও কৃষকরা স্বরণ করেন।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান
বাংলাদেশের আয়তনের তুলনায় অধিক জনসংখ্যার গুরুত্ব বিবেচনা করে তাদেরকে জনশক্তিতে রূপান্তরে জিয়াউর রহমানের চিন্তা ছিল সূদুর প্রসারী। তার কূটনৈতিক সফলতার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে তিনি সফল হন। তার রাষ্ট্র পরিচালনার সময়ে সরকারি ভাবে ১৯৭৬ সালে কুয়েতে ছয় হাজারের বেশি শ্রমিক পাঠানো হয়। এই খাতের সফলতার মাধ্যমে বিদেশে অধিক কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তিনি ১৯৭৬ সালে জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরো (BMET) প্রতিষ্টা করেছিলেন। শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে তিনি যুব উন্নয়ন কেন্দ্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। এর মাধ্যমে বিদেশে শ্রমিকদের সহজে কাজ পাওয়া, নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও অধিক রেমিট্যান্স অর্জনের পথ সুগম হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস হচ্ছে রেমিট্যান্স যেটা জিয়াউর রহমান শুরু করে গেছেন। এছাড়াও গ্রামীণ জনপদের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা, আমাদানির অর্থ পরিশোধ ও অর্থনৈতিক খরাতে স্বস্তি দিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ছিল ৬.৫৭ শতাংশ। এই খাতের আজকের এই অবস্থান ও উন্নয়নে জিয়াউর রহমানের পদক্ষেপগুলো যথাযথ ভূমিকা রেখে চলছে।
গার্মেন্টস শিল্পের উত্থান ও বিকাশ
জিয়াউর রহমান কৃষি ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন সবসময়। তার শাসনামলে মানুষের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। কর্মের মাধ্যমে মানুষকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করে সমাজের নানা অপরাধ হ্রাসে তিনি সুদূরপ্রসারী চিন্তা করতেন। তার ভাবনায় ছিল শুধু কৃষি উপর নির্ভর না থেকে বাংলাদেশেকে শিল্পায়নের পথেও হাঁটতে হবে। এই চিন্তা থেকেই তৈরি পোশাক শিল্পের সূচনা ও বিকাশে তিনি কাজ করেন। তার সরকারের পলিসি দেশে উদ্যোক্তা বান্ধব পরিবেশ তৈরি করে। ফলে গার্মেন্টস শিল্প আজ এই পর্যায়ে এসেছে। যা এখন আমাদের অর্থনীতির প্রানশক্তি। বর্তমানে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখের অধিক মানুষ কাজ করছেন, যার মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ নারী। ফলে গ্রামীণ অর্ধশিক্ষিত নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষমতায়নে তার এই পদক্ষেপ যথাযথ কাজ করেছে। দেশের জিডিপিতে প্রায় ১০-১১% অবদান রাখে পোশাক শিল্প। ১ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই সেক্টর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। যা সম্ভব হয়েছে জিয়াউর রহমানের বাস্তবধর্মী চিন্তার কারণে।
এছাড়াও, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করে অনেক রাজনৈতিক দলকে নতুন করে রাজনীতি করার পথ তৈরি করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে মতপ্রকাশের পথ উন্মোচন ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ মসৃণ করে গেছেন।
ফলে বলা যায়, আজকের বাংলাদেশ যখন বেকারত্ব, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ সব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চর্চার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন জিয়াউর রহমানের কৃষিনির্ভর উন্নয়ন ভাবনা, রেমিট্যান্সবান্ধব নীতি, শিল্পায়নের সূচনা এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদের দর্শন নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। ইতিহাসের বিভিন্ন সফল শাসকদের মতো তার নেতৃত্বে ও রাষ্ট্র পরিচালনাতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবে তার উন্নয়নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। জন্মদিনে জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করা মানে কেবলমাত্র অতীতচর্চা না করে তার দূরদর্শী নীতি, পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার আলোকে রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজ করতে সকলকে নিয়ে একসাথে পথচলা এবং জনসাধারণকে একটি অর্থবহ ও সুন্দর ভবিষ্যত উপহার দেওয়া।
পরিশেষে, জিয়াউর রহমানকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং পরকালের শান্তি কামনা করছি।
লেখক: অফিসার, ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ