ফেলানীর বাড়িতে যাওয়ার আগে আমি তাকে চিনতাম একটি ছবির মাধ্যমে—কাঁটাতারে ঝুলে থাকা এক কিশোরীর নিথর দেহ। কিন্তু কুড়িগ্রামের দক্ষিণ রামখানা গ্রামে সেই বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে বুঝেছি, ফেলানী কোনো ছবি নয়, কোনো প্রতীকও নয়। সে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত শৈশব, আর চৌদ্দ বছর ধরে টিকে থাকা এক অমীমাংসিত রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা; রাষ্ট্রের সংকট।
গত রমজানের এক বিকেলে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। ইফতারের সময়। কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নয়, কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ হিসেবেও নয়। একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়— একজন মানুষ হিসেবে। সফরসঙ্গী ছিল ইয়ুথ জার্নালিস্ট কমিউনিটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম যখন আমাদের সামনে বসেছিলেন, তার চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু ক্লান্তি। যে ক্লান্তি আসে তখনই, যখন কেউ দীর্ঘ সময় ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকে এবং বুঝে যায়— এই অপেক্ষার শেষ কোথায়, কেউ জানে না।
ফেলানীর মা জাহানারার সঙ্গে কথা বলা আরও কঠিন। কারণ তার প্রশ্নগুলো সরল, কিন্তু উত্তরগুলো রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর। ‘আমার মেয়ে কী অপরাধ করেছিল?’ এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো কূটনৈতিক ভাষা টেকে না, কোনো আইনি জটিলতাও নয়। এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে কেবল দুটি পথ খোলা থাকে—ন্যায়বিচার অথবা নির্লজ্জ নীরবতা। চৌদ্দ বছর ধরে আমরা দ্বিতীয় পথটিই দেখছি।
২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি সীমান্তে যা ঘটেছিল, সেটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি কাঠামোগত সহিংসতার অংশ। নিরস্ত্র এক কিশোরী পোশাক আটকে যাওয়ায় চিৎকার করেছিল—এই অপরাধে তাকে গুলি করা হয়েছিল। এরপর তার দেহ পাঁচ ঘণ্টা ধরে কাঁটাতারে ঝুলে ছিল। এই পাঁচ ঘণ্টা কেবল একটি লাশ ঝুলে থাকার সময় নয়; এটি ছিল মানবাধিকার, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং সভ্যতার ঝুলে থাকার সময়।
ফেলানীর হত্যার পর যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা আদতে বিচার নয়, এটি এক ধরনের সময়ক্ষেপণমূলক আত্মরক্ষা ব্যবস্থা। বিএসএফের অভ্যন্তরীণ আদালতে অভিযুক্ত অমিয় ঘোষের খালাস, পুনর্বিচারের নামে বছরের পর বছর ধরে মামলা ঝুলে থাকা, সুপ্রিম কোর্টে অগ্রাধিকার না পাওয়া, হাইকোর্টে টেকনিক্যাল জটিলতার অজুহাত—এই সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। এখানে প্রশ্ন ছিল না কে দোষী, প্রশ্ন ছিল কিভাবে দায় এড়ানো যায়।
ফেলানীর বাড়িতে বসে আমার বারবার মনে হয়েছে—এটি শুধু ভারতের বিচার ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, এটি আঞ্চলিক নৈতিকতার ব্যর্থতা। সীমান্তে হত্যা কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্ন। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত এই প্রশ্নকে কখনোই সে গুরুত্বে নেয়নি, যেভাবে নেওয়া উচিত ছিল। বরং দায় চাপানো হয়েছে নিহত শিশুটির বাবার ওপর, ক্ষতিপূরণকে পরিণত করা হয়েছে অনুগ্রহে, আর ন্যায়বিচারকে আটকে রাখা হয়েছে আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায়।
এই দীর্ঘ অন্ধকারের ভেতরেও ফেলানীর বাড়িতে আমি একটি আলো দেখেছি। ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে যোগ দিয়েছে। যে সীমান্ত তার বোনের জীবন কেড়ে নিয়েছে, সেই সীমান্তকেই মানবিক করার শপথ নিয়ে সে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের পক্ষে। এটি প্রতিশোধের গল্প নয়, এটি রাষ্ট্রের ওপর আস্থার গল্প। যে আস্থা ফেলানীর বাবা-মা ভারতের রাষ্ট্রের ওপর রাখতে পারেননি, সেই আস্থা আরফান রেখেছে বাংলাদেশের একটি বাহিনীর ওপর। এটি আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি একটি নৈতিক দায়ের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এই পরিবারের পাশে থেকেছে—এটি কাগজে লেখা কোনো দাবি নয়, এটি আমি নিজ চোখে দেখেছি। দাফন থেকে শুরু করে জীবিকার সহায়তা, নীরব সঙ্গ থেকে শুরু করে আরফানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন—এই সবকিছুই হয়েছে। রাষ্ট্রও প্রতীকি স্বীকৃতি দিয়েছে। রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম আজ ফেলানী এভিনিউ। কূটনৈতিক এলাকার ভেতর এই নাম প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়—এই রাষ্ট্র ভুলে যায়নি।
কিন্তু ফেলানীর বাড়িতে বসে আমার মনে হয়েছে—স্মরণ যথেষ্ট নয়। নামফলক যথেষ্ট নয়। প্রতীক তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ন্যায়ের দিকে নিয়ে যায়। ফেলানী এভিনিউ তখনই সত্যিকারের অর্থ পাবে, যখন সীমান্তে গুলি থামবে, যখন দায়ী ব্যক্তি শাস্তির মুখোমুখি হবে, যখন আর কোনো শিশুর দেহ কাঁটাতারে ঝুলবে না।
আমি ফেলানীর বাড়ি থেকে ফিরেছিলাম এক ধরনের ভার নিয়ে। সেটি শোক নয়, সেটি ক্ষোভও নয়। সেটি দায়িত্ববোধ। কারণ সাংবাদিক হিসেবে আমরা শুধু ঘটনা লিখি না, আমরা রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রাখি। ফেলানীর দেহ বহু আগেই কাঁটাতার থেকে নামানো হয়েছে। কিন্তু তার জন্য ন্যায়বিচার এখনো ঝুলে আছে। এই ঝুলে থাকা অবস্থা শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক।
প্রশ্ন একটাই— আর কত ফেলানীর রক্ত ঝরলে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করবে বিএসএফ?
লেখক: কবি ও লেখক