ঢাকা: সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে সহিংসতামুক্ত এক অসাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছোটখাটো অভিযোগ ও পালটা কিছু অভিযোগ ছাড়া এই নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতামুক্ত। এই নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো দিক হলো- নির্বাচন চলাকালীন দেশের কোথাও বড় ধরনের কোন সংঘর্ষের ঘটনা কিংবা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ফলে দেশজুড়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে ভোটগ্রহণ। এখন চলছে গণনা ও ফলাফলের অপেক্ষা। দেশবাসীর প্রত্যাশা ফলাফল প্রকাশের পরেও কোনো ধরনের সহিংসাতার ঘটনা ঘটবে না। একইসঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, তা সব দল মেনে নিবে এবং সহিংসতামুক্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
এদিকে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য মুক্তির দিন এবং মহা ঈদের দিন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, তিনি বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর গুলশানে ভোটপ্রদানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আজকে আনন্দের দিন। ঈদের মতো একটি উৎসব চলছে।’ তিনি দেশবাসীকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের আহ্বান জানান এবং সবাইকে গণভোটে অংশ নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। এ ছাড়াও তিনি নির্বাচনের পরিবেশ দেখার জন্য রাজধানীর একাধিক ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং পুলিশ সদর দফতরে অবস্থিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় স্থাপিত অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ কক্ষ থেকে সারাদেশের ভোটদানের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে (শেরপুর-৩ আসনে মৃত্যুতে ভোট স্থগিত) ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। প্রার্থীদের মধ্যে নারী ৮৩ জন, দলীয় ৬৩ ও স্বতন্ত্র ২০ জন। বিএনপির নারী প্রার্থী ১০ জন হলেও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থী দলগুলোর কোনো নারী প্রার্থী নেই।
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নানান দিক থেকে ব্যতিক্রমী ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি হতে পারে অংশগ্রহণের দিক থেকে, ভোটারের উপস্থিতির হার, রাজনৈতিক ঐক্য, প্রযুক্তির ব্যবহার, কিংবা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে। ভোটারের উপস্থিতির হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলেই প্রত্যাশা। এই নির্বাচনে নতুন প্রজন্মের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা গেছে। এদের মধ্যে কেউ প্রথম ভোটার আবার কেউ ভোটার হয়েও ভোট দিতে পারেননি। আবার অনেকে আছেন যারা দীর্ঘ সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ায় ভোট দিতে পারেননি।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে এই নির্বাচন নিয়ে ভোটারের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ভোট দেয়ার জন্য সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। অনেক কেন্দ্রেই ভোটারের দীর্ঘ লাইন ছিল চোখে পড়ার মতো। এছাড়াও কেন্দ্রে নারী ও তরুণদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এর অন্যতম কারণ ছিল বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৬। সময়ের ব্যবধান ১৭ বছর। এই সময়ে হয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এগুলোর মধ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘বিনা ভোট’ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচন ‘আমি-ডামির’ ভোট হিসেবে পরিচিত।
কারণ, এই নির্বাচনগুলোতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও তাদের সহযোগী দলগুলো অংশ নিত। কিন্তু, বাংলাদেশের বৃহত্তম দল বিএনপি নির্বাচনগুলো বয়কট করে। এমনকি বিএনপির জোটমিত্র দলগুলোও নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ফলে নির্বাচনগুলো দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। শুধু সংসদ নির্বাচনই নয় বিগত ১৭ বছর দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে সব ধরনের নির্বাচন ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ ও এক তরফা এবং নির্বাচনের ফলাফল ছিল পূর্ব নির্ধারিত। ফলে এসব নির্বাচনে কোন কোনটিতে ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলেও মতের প্রতিফলনের সুযোগ না থাকায় জনগণ ভোট দিতে যায়নি।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে দেশী বিদেশীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। এবারের নির্বাচনে ২৪-এর গণআন্দোলনে পরাজিত শক্তি আওয়ামী লীগ ‘গণহত্যা’র দায়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট এই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে নির্বাচন চলাকালীন সময়ে এই দুই দলের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নির্বাচন নিয়ে কোন বড়ধরনের অভিযোগ আসেনি। ফলে আশা করছি ফলাফল ঘোষণার পরেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশে বিগত কয়েকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের (আগে-পরে) প্রায় ৪৯ জন নিহত হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল ভয়াবহ। ওই নির্বাচনে প্রায় ৫০০ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে কম সহিংসতার নির্বাচনের মধ্যে একটি। নির্বাচনি সহিংসতায় মারা যান ২১ জন। কিছু রিপোর্টে মাত্র ১১ জন নিহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সহিংস নির্বাচন। নির্বাচনি সহিংসতায় প্রায় ১১৫–১৪২ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন সূত্রের ভিন্ন সংখ্যাও পাওয়া গিয়েছে। তবে এ সংখ্যা ১৪২ এর বেশি নয়। সারাদেশে ভোটের দিনই অন্তত ১৮–২১ জন নিহত হয়। অনেক কেন্দ্র পুড়িয়ে দিয়েছিল জনতা। ২০১৮ সালের ১১তম নির্বাচন ভোটের দিনে অন্তত ১৮ জন নিহত হয় এবং প্রায় ২০০ জনের মতো আহত হয়। আর ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার পর ১৬ জন লোক নিহত এবং বহুসংখ্যক আহত হয়েছিল। তবে চলতি ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিন কোন সহিংসতার ঘটেনি বললেই চলে।
একনজরে এবারের নির্বাচনে পরিসংখ্যান
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার মিলিয়ে মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছে।
নিরাপত্তায় বাহিনীর বিশাল বহর
সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী ১ লাখ ৩ হাজার, নৌবাহিনী ৫ হাজার (উপকূলীয় ১৭ আসনে), বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৫০০ জন, পুলিশ ও র্যাব ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫২ জন, আনসার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন, বিজিবি ও অন্যান্য ৪২ হাজার ৯৬০ জন।