ভাষা আন্দোলন, বাঙালির অস্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের এক অদম্য চেতনা। এ-জনপদের বাঙালি মুসলমানরা পাগলপারা হয়ে অংশ নিয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনে। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু, আবুল হাশিম, তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ সকলেই ‘লড়কে লেংগি পাকিস্তান’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা পেরিয়ে যখন অর্জিত হলো তাদের স্বপ্নের পাকিস্তান, সেই স্বপ্নের পাকিস্তান জন্মের শুরুতেই, স্বপ্ন ভঙ্গের যাতনায় পিষ্ট হতে হলো বাঙালি জনগোষ্ঠীকে। প্রস্তাব এলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংহতির বেদীমূলে উৎসর্গ করতে হবে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে লালিত প্রাণের বাংলা ভাষাকে। কিন্তু, স্বাধীনচেতা বাঙালি সহজে মাথা নোয়াবার নয়। তাই, ভাষার জন্যে প্রথমে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক অতঃপর রক্তস্নাত রাজনৈতিক সংগ্রাম।
১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে প্রতিষ্ঠিত হলো স্বাধীন পাকিস্তান। হাজার মাইলের ব্যবধানে গঠিত দুটি ভূ-খণ্ডের একটিরাষ্ট্রকে তৎকালীন রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীরা একে আখ্যা দিয়েছিল একটি ‘অদ্ভুত রাষ্ট্র’ (peculiar state) হিসেবে। সুদীর্ঘ দু-শ বছরের গোলামির অবসান ঘটিয়ে নব-প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে অন্যান্যদের মতো বাঙালি মুসলমানদের মনে আনন্দ উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। কিন্তু, এ-অথৈ আনন্দ উচ্ছ্বাস ফিকে হতে থাকে ক্ষণকালের মধ্যেই। শুরুতেই মুসলিমলীগ শাসকচক্র বুনতে থাকে ষড়যন্ত্রের জাল। বাঙালিকে কোণঠাসা করার জন্য পাকিস্তানের সংহতির নামে উর্দুকে তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ফন্দি আঁটতে থাকে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম প্রস্তাব রাখেন ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দীন আহমদ। যদিও তখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তিনি যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ভারতে যেহেতু হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করা হচ্ছে, সেহেতু উর্দুকে পাস্তিানের রাষ্ট্রভাষা করা যেতে পারে। ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমদের এ-অভিমতের কোনো প্রতিবাদ তখন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেউ করেননি। পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ ও শিক্ষিতমহলের সচেতন হবার জন্য ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায়, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক, ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তিনি এ-প্রবন্ধে দেখিয়ে বলেন, উর্দু পাকিস্তানের কোন প্রদেশেরই মাতৃভাষা নয়। তার মতে, বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোনো ভাষা যদি রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করতে হয় তবে, উর্দুকে বিবেচনা করা কর্তব্য। ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমদ কর্তৃক শিক্ষার বাহন হিসেবে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে মত ব্যক্ত হওয়ায়, একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এ-প্রস্তাব বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতির পরিপন্থীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বিগর্হিত বলে আখ্যা দেন। ডক্টর মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার সপক্ষে একাধিক পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন।
‘তমদ্দুন মজলিশ’ গঠন
১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র ও অধ্যাপকের উদ্যোগে ‘তমদ্দুন মজলিশ’ গঠিত হয়। এ-প্রতিষ্ঠানটি পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষার প্রশ্নে প্রথম থেকেই সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম চালাতে থাকে। তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু এ-নামে একটি পুস্তিকা বের করেন ১৫ সেপ্টেম্বর। এতে লিখেন, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হেসেন এবং আইনজীবী, রাজনীতিক ও সাহিত্যিক জনাব আবুল মনসুর আহমদ। এ-পুস্তিকায় তমদ্দুন মজলিশের পক্ষে ভাষা বিষয়ক কিছু প্রস্তাবনা সংযোজিত হয়, যা সংগঠনের সম্পাদক অধ্যাপক আবুল কাসেম কর্তৃক লিখিত। এ প্রস্তাবনায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, অফিস আদালতের ভাষা করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়। তিনি রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে আরো বলেন, ইংরেজরা যেমন আমাদের উপর ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল সেইভাবে কেবল উর্দু ও বাংলাকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করলে পূর্ববৎ সাম্রাজ্যবাদী অযৌক্তিক নীতিরই অনুসরণ করা হবে। তিনি এধরনের তৎপরতা প্রতিহত করতে আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এ-পুস্তিকায় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন তার ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব-পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান তুলে ধরেন এবং উর্দুকে পরভাষা এবং সে-ভাষা চাপিয়ে দিয়ে যাতে ইংরেজের স্থান অন্য কোন প্রদেশ দখল করে না বসে সে-দিকে সজাগ থাকতে বলেন। আবুল মনসুর আহমদ ‘বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি অশিক্ষিত ও চাকরির অযোগ্য বনে যাবেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ফারসির জায়গায় ইংরেজীকে রাষ্ট্রভাষা করিয়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম শিক্ষিত সমাজকে রাতারাতি অশিক্ষিত ও সরকারি কাজের অযোগ্য করেছিল।’ (তথ্যসূত্র: বদরুদ্দিন উমর: পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, পৃ. ২৯)
পাকিস্তান সৃষ্টির ৩ মাস পর, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাজধানী করাচিতে একটি শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, সে শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ-সংবাদ ‘মর্নিং নিউজে’ প্রকাশিত হলে, শিক্ষা সম্মেলনের এ-সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ৬ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা প্রতিবাদ সমাবেশ করে। এতে সভাপতিত্ব করেন তমদ্দুন মজলিশের সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জনাব আবুল কাশেম। এতে বক্তব্য দেন সর্বজনাব, মুনীর চৌধুরী, আব্দুর রহমান, কল্যাণ দাশ গুপ্ত, এ. কে. এম. আহসান, এস. আহমেদ প্রমুখ। বক্তারা বাংলাকে সাংস্কৃতিক দাসত্বের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র এবং বাঙালিত্বকে খর্ব করার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার আহ্বান জানান। এ-সভাই ছিল রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সভা। এক ঘণ্টা সভা চলার পর মিছিল সহাকারে এরা বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সেখানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আফজাল ছাত্রদের সামনে বক্তব্য দেন এবং বাংলা ভাষার দাবিকে সমর্থন করার অঙ্গীকার করেন।
এরপর প্রাদেশিক মন্ত্রী নূরুল আমিন, হামিদুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন সাহেবের বাস ভবনে গিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতি মৌখিক ও লিখিত সমর্থন আদায় করেন। ভাষা আন্দোলনকে একটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে একে রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত করার ব্যাপারে তৎকালীন কোন বড়মাপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা দলের কোন বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল না। বরং একে চরম রাজনৈতিক সংগ্রামে উপনীত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছাত্রসমাজ। (তথ্যসূত্র: মোহাম্মদ হান্নান: বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, পৃ. ৪৬-৪৮)
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে করাচিতে। পূর্ব-বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বনামধন্য সন্তান বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত, ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ভাষা করার জন্য সংশোধনী প্রস্তাব আনেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি এর ওপর আলোচনা হলে এ নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ সমস্ত মুসলিম লীগ নেতারা একে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেন, এমনকি বাঙালি মুসলিমলীগ সদস্যরাও এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এ-সংবাদ ঢাকায় পৌঁছলে, মুসলিমলীগ সদস্যদের বিরুদ্ধে ২৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ধর্মঘট পালিত হয়। ২ মার্চ এ-বিষয়কে সামনে রেখে আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ফজলুল হক হলে পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতাদের এক সভা, কমরুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- রণেশ দাস গুপ্ত, অজিত গুহ, আবুল কাশেম, নঈমুদ্দিন আহমদ, তফজ্জল আলী, মোহাম্মদ তোয়াহা, শহীদুল্লাহ কায়সার, সরদার ফজুল করিম ও তাজ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ।
এ-সভায়, ভাষা আন্দোলনকে সুষ্ঠু ও সাংগঠনিক রূপ দানের জন্য প্রতিদল থেকে দু-জন সদস্য নিয়ে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। এই সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১১ মার্চ হরতাল ডাকার কথা সংবাদপত্রে পড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ছাত্র-জনতার ওপর ১১ মার্চ নেমে আসে পুলিশি ও সরকারি গুন্ডা বাহিনীর চরম নির্যাতন। ফলে এর প্রতিবাদে ১৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ১৪ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় ধর্মঘট পালিত হয়।
১৫ মার্চ বর্ধমান হাউসে (বর্তমান বাংলা একাডেমি) মুসলিমলীগ সংসদীয় দলের সভা হয় এবং রাত নয়টা পর্যন্ত ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই তারিখে প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক তর্ক-বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ছাত্রদের প্রণীত সাতদফা চুক্তি নামায় প্রধানমন্ত্রী সই করেন যার দুটি দফার মধ্যে বন্দী মুক্তি এবং বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষার মর্যাদা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু, চুক্তির কথা সাধারণ ছাত্ররা জানত না। ফলে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। ১৬ মার্চ আবারও সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে এবং বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ছাত্ররা সংসদ ভবনের দিকে ধাবিত হয়। অবশ্য এ তৎপরতা ছিল চুক্তিনামার বরখেলাপ। এ-ঘটনায় সংসদে হট্টগোল সৃষ্টি হয় এবং অবস্থা বেগতিক দেখে খাজা নাজিম উদ্দিন পরিষদ ভবনের পেছন দিয়ে পালিয়ে যান। আয়ুবখান তখন পূর্ব-পাকিস্তানের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং। তিনি বাহিরে এসে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের উদ্দেশে বলেন, ‘পাখি উড়ে গেছে’। এ আন্দোলনের অভিঘাত সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে। (বদর উদ্দিন উমর-পূর্বোক্ত পৃ. ৮১-৮২ অলি আহাদ : জাতীয় রাজনীতি ৪৭-৭৫, পৃ. ৪৪, মোহাম্মদ হান্নান: পূর্বোক্ত পৃ. ৫০-৫১)
জিন্নাহর পূর্ব বাংলায় আগমন
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফর উপলক্ষ্যে ঢাকা আসেন। বিমান বন্দরে অবতরণ করলে তাকে অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত ঐতিহাসিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স জনারণ্যে পরিণত হয়। কারণ, পাকিস্তান অর্জনের একচ্ছত্র নায়ক হিসেবে জিন্নাহ এর ইমেজ ছিল তখন এক উত্তুঙ্গ উচ্চতায়। মাত্র দু-দিন আগে যে সমগ্র ঢাকাব্যাপী মুসলিমলীগ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের আসন টলিয়ে তুলেছিল সে অবস্থার চিহ্নমাত্র পরিদৃষ্ট হয়নি।
২১ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তার ভাষণে কেবল উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলার সময় ময়দানের কোনো কোনো এলাকায় মৃদু গুঞ্জন হয়। তবে মোটামুটিভাবে বিরাট জনসমুদ্র শান্তভাবে জিন্নাহর বক্তব্য শোনে। (বদরুদ্দিন:পূর্বোক্ত, পৃ. ৯৫)
২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন উৎসবে ভাষা প্রশ্নে যখন জিন্নাহ বলেন, ‘Urdu, only urdu shall be the state language of Pakistan.’ এর সঙ্গে সঙ্গে No, no বলে, প্রতিবাদ করতে থাকে ছাত্ররা। ফলে তিনি কিছুক্ষণের জন্য থমকে যান। এরপর, ব্যাখ্যার সুরে কিছুটা নরম হয়ে ব্যক্তিগত মত হিসেবে চালিয়ে বলেন, ‘আমার মতে একমাত্র উর্দুই হতে পারে সেই ভাষা।’
২৪ মার্চ সন্ধ্যায় জিন্নাহ’র আমন্ত্রণে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, সর্বজনাব, শামসুল হক, অলি আহাদ, কমরুদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম, আজিজ আহমদ, শামসুল আলম, তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তোয়াহা, নঈমুদ্দীন আহমদ সাক্ষাৎ করেন। এসময় ভাষা প্রশ্নে জিন্নাহর সঙ্গে তাদের যুক্তিতর্ক হয় এবং অলি আহাদ এক পর্যায়ে জিন্নাহ’র উদ্দেশ্যে উদ্ধতবাক্য প্রয়োগ করেন। (বদরুদ্দিন উমর, পূর্বোক্ত পৃ. ৯৯)
খাজা নাজিমুদ্দীনের বেইমানি
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫০, ১৯৫১ সালে পালন করেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন জনাব আব্দুল মতিন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন ঘটেছে। জিন্নাহ’র মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ফলে, খাজা নাজিম উদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৫২ সালের ২৬ জনুয়ারি ঢাকায় পাকিস্তান মুসলিমলীগের সম্মেলন শুরু হয়। এ-উপলক্ষ্যে ২৭ জানুয়ারি একটি জনসভা পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়। এ-সভায় খাজা নাজিমুদ্দীন ইতঃপূর্বে ছাত্রদের সঙ্গে সম্পাদিত ৮দফা চুক্তির কথা উপেক্ষা করে তার পূর্বসূরিদের মতো ঘোষণা করেন, ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ ফলে, পুনর্বার আন্দোলনমুখর হয়ে উঠে পূর্ববাংলা। (মোহাম্মদ হন্নান : পূর্বোক্ত পৃ. ৯৯-১০০, মওদুদ আহমদ বাংলাদেশ স্বায়ত্ত শাসন থেকে স্বাধীনতা, পৃষ্ঠা-২৫)
‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠন
খাজা নাজিমুদ্দীনের বক্তব্যের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এক ধর্মঘট ডাকে। ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২, পূর্বপাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী মুসলিমলীগের সহযোগিতায় ঢাকার বার লাইব্রেরিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এক সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে। এতে অনেক পার্টি অংশগ্রহণ করে। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে এ-সভায় ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠিত হয়, এর সদস্য সংখ্যা ছিল চল্লিশোর্ধ্ব। এর আহ্বায়ক মনোনীত হন কাজী গোলাম মাহবুব। এসময় জননিরাপত্তা আইনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্দি ছিলেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকানগরে ছাত্রধর্মঘট, সভা ও শোভাযাত্রার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করা হয়। আর ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশন তারিখ হিসেবে, সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ হরতাল, সভা, বিক্ষোভ মিছিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি অচিন্তনীয়ভাবে সাফল্য লাভ করে।
৬ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের এক সভা হয়। সভায় অর্থ সংগ্রহের জন্য ১১ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছাত্ররা ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রি করে চাঁদা সংগ্রহ করবে। সংগ্রাম পরিষদের সভায় সরকার যদি ১৪৪ ধারা জারি করে তাহলে তা ভাঙা হবে কিনা তা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রায় সকলেই ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। অলি আহাদ সাহেব ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে দৃঢ় মত ব্যক্ত করেন। মওলানা ভাসানী, তাকে জোরালো ভাবে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, ‘যেই সরকার আমাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনকে ইচ্ছাকৃতভাবে বানচাল করার জন্য অন্যায়ভাবে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করে, সেই সরকার কর্তৃক জারীকৃত নিষেধাজ্ঞা মাথা নত করিয়া গ্রহণ করার অর্থ স্বেচ্ছাচারের নিকট আত্মসমর্পণ।’ তবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে কোনো প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছাড়াই সভা মুলতবি হয়।
১৪৪ ধারা ভাঙা নিয়ে বিতর্ক
২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী মুসলিম লীগের সদর দফতরে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে। মওলানা ভাসানীর উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি মনে করা হলেও তিনি মফস্বলে রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকায়, তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ১৯ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে টুঙ্গী পাড়াস্থ তার নিজবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ইতোমধ্যে, সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় ক্রমাগত ১ মাসের জন্য ঢাকা জেলার সর্বত্র সভা, সমাবেশ, হরতাল, মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। এমতাবস্থায়, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রশ্নে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। অধিকাংশ সদস্য ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে মত দেন এজন্যে যে, সরকার ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে জরুরি অবস্থার অজুহাতে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। অলি আহাদ, আব্দুল মতিন যুক্তি দিতে থাকেন যে, ১৪৪ ধারা না ভাঙলে ভাষা আন্দোলনের এখানেই অনিবার্য মৃত্যু ঘটবে।
ঠিক, এসময় সলিমুল্লা হল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল এসে জানিয়ে দেয়, ছাত্ররা আগামীকাল ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করবে। ২০ ফেব্রুয়ারি কমিউনিস্ট পার্টির আত্মগোপনে থাকা নেতৃবৃন্দ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত ব্যক্ত করে শহীদুল্লাহ কায়সার, তকিউল্লাহর মাধ্যমে মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ ও দেওয়ান মাহবুব আলীকে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তিনজন ছাড়া সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সকলেই ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মত দেন এবং তারা আরো বলেন, ছাত্ররা যদি তা না মেনে নেয়, তবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ কমিটি তখন থেকেই বিলুপ্ত হবে।
রক্তাক্ত একুশ
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এমন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ছাত্রদের মনে বিক্ষুব্ধ অবস্থা বিরাজ করে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা-ভবন প্রাঙ্গণে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা দ্বিগুণ উৎসাহ উদ্যমে ১৪৪ ধারা ভাঙার উদ্দেশ্যে জমায়েত হতে থাকে। বিশেষ করে যুবলীগ নেতা কর্মীরা এ-ধারা ভঙ্গ করার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। বেলা ১২টার দিকে যুবলীগ নেতা ও ফজলুল হক হলের বয়োজ্যেষ্ঠ ছাত্রনেতা জনাব গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ঐতিহাসিক ‘বেল তলায়’ সাধারণ ছাত্রসভা হয়। এতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৪জন, ৬জন, ৮জন, ১০জন করে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার্থে ১৪৪ ধারা ভাঙার দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এভাবে ছাত্ররা একের পর এক, দলে দলে বিভক্ত হয়ে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে ক্রমশ উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পুলিশের লাঠি চার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, ব্যাপক গ্রেফতার আর ছাত্রদের ইট-পাটকেল নিক্ষেপে ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ধৈর্য ও সহনশীলতা হারিয়ে ঢাকার তৎকালীন জেলা প্রশাসক কোরাইশী গুলি চালাবার নির্দেশ দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয় রফিক, জব্বার, এম.এ ক্লাসের ছাত্র সালাউদ্দিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র আবুল বরকত। সংঘর্ষের ব্যাপকতা এবং লাশ গুম করার ফলে নিহতের সঠিক সংখ্যা নির্ণীত হয়নি। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব বাংলায় দ্রোহের আগুনে উত্তাল অবস্থা বিরাজ করে। ছাত্র-শ্রমিক, সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সর্বস্তরের জনতা হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে।
আইন পরিষদ পরিস্থিতি
২১ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন চলছিল। ছাত্র হত্যার সংবাদ পরিষদে পৌঁছার পর বিরোধী দলীয় সদস্যরা এর কৈফিয়ত দাবি করেন। মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘কয়েকজন ছাত্র গুরুতর আহত হয়েছে শুনে আমি ব্যথিত হয়েছি। কিন্তু আমাদের ভাবাবেগে চালিত হলে চলবে না।’ নুরুল আমিনের এ-বক্তব্যে মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য, মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ গর্জে উঠেন। তিনি অধিবেশনে মুলতবি প্রস্তাব আনেন এবং বলেন, ‘যখন আমাদের বক্ষের মানিক, আমাদের রাষ্ট্রের ভাবি নেতা ৬ জন রক্ত শয্যায় শায়িত, তখন আমরা পাখার নিচে বসে হাওয়া খাব এ আমি বরদাস্ত করতে পারি না। আমি জালেমের এই জুলুমের গৃহ পরিত্যাগ করছি।’ তার সঙ্গে খয়রাত হোসেন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, বেগম আনোয়ারা খাতুন ও কংগ্রেস দলীয় সদস্যরা ওয়াক আউট করেন। জনাব আবুল কালাম শামসুদ্দীন গুলি চালাবার প্রতিবাদে ২২ তারিখ পার্লামেন্টারি পার্টি ও সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিকেল ৩ টায় আইন পরিষদের অধিবেশন আবারও বসে। দিশাহীন নুরুল আমিন সরকার বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করে এক প্রস্তাব পাশ করে। এর পর ১৯৫৬ সালে প্রণীত পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ২১৪ নং ধারায় বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় রাজনীতির এক মাইলফলক। একটি যৌক্তিক সাংস্কৃতিক তৎপরতাকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করে ব্যাপক আত্মত্যাগের বিনিময়ে একে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব মূলত ছাত্র সমাজের। এ-আন্দোলনের পুরোভাগে ছাত্রসমাজের অবস্থান এ-দেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসকে গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত করেছে। তাদের রক্তস্নাত ত্যাগ একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখার ভিত রচনা করে দিয়েছে। দেশের যে-কোনো দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে তাদের এই আত্মত্যাগ যুগে যুগে প্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করছে। মহান ভাষা আন্দোলনে শাহাদাত বরণকারী ও অংশগ্রণকারী সকলের প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।
লেখক: অধ্যক্ষ, সরাইল সরকারি কলেজ