Wednesday 04 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশে মশা দমনের আধুনিক পথ

কবীর আহমেদ ভূইয়া
৪ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৫

বাংলাদেশে মশার উপদ্রব এখন শুধু নাগরিক দুর্ভোগ নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং চিকনগুনিয়ার মতো রোগগুলো প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষকে আক্রান্ত করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শুধু ধোঁয়া দেওয়া বা স্প্রে করেই আর মশা দমন সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন বিজ্ঞাননির্ভর, প্রযুক্তিভিত্তিক, এবং স্থায়ী সমাধান।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যদি সেই প্রযুক্তিগুলো সঠিকভাবে ব্যবহারে সক্ষম হয়, তবে অল্প সময়েই মশা সমস্যার ব্যাপক উন্নতি হবে। নিচে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য সব আধুনিক সমাধান ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।

বিজ্ঞাপন

১. জেনেটিকালি-মডিফায়েড (GM) মশার ব্যবহার

মশা দমনে এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি।
GM প্রযুক্তিতে বিশেষভাবে পরিবর্তিত পুরুষ মশা ছাড়া হয়, যারা স্ত্রী মশার সাথে মিলিত হলে তাদের ডিম ফুটে না। ফলে মশারসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়।

বাংলাদেশে এর ব্যবহার কীভাবে করা যাবে:

ঢাকার উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাইলট প্রকল্প চালানো।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বায়োটেক ল্যাবে গবেষণা সক্ষমতা তৈরি করা।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমিক মোতায়েন।
ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রযুক্তি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিপ্লব এনেছে।

২. BTI ও আধুনিক লার্ভিসাইড—পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ

BTI (Bacillus thuringiensis israelensis) মশার লার্ভা ধ্বংস করে কিন্তু মানুষ বা পরিবেশের ওপর কোনো ক্ষতি করে না।
এটি লার্ভা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি।

কিভাবে ব্যবহার করা যায়:

প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে BTI মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা।
নালা-খাল, ডোবা, পানিজমা স্থানগুলোতে নিয়মিত BTI প্রয়োগ।
BTI উৎপাদনের জন্য দেশেই বায়োটেক কারখানা স্থাপন।
৩. Autocidal Gravid Ovitrap (AGO) — মশার ফাঁদ প্রযুক্তি
এই বিশেষ ফাঁদে স্ত্রী এডিস মশা ডিম পাড়তে এসে নিজেই মারা যায়।
ফাঁদগুলো রাসায়নিকমুক্ত, সহজে স্থাপনযোগ্য ও অত্যন্ত কার্যকর।

বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিকতা:

আবাসিক এলাকায় AGO ফাঁদ স্থাপন করে মশার ঘনত্ব ৫০–৭০% পর্যন্ত কমানো যায়।
বাজার, বাসস্ট্যান্ড, হাসপাতাল—উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় AGO বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

৪. ড্রোন-ভিত্তিক লার্ভিসাইড স্প্রে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ড্রোন ব্যবহার করে—
বড় জলাশয়।
রিজার্ভার।
নিষ্কণ্টক বা ঢোকার অযোগ্য স্থান
বস্তি ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা
এগুলোতে লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য সুবিধা:

স্বল্প সময়ে বিশাল এলাকায় স্প্রে করা সম্ভব।
শ্রম কম লাগে।
নির্ভুলভাবে পানিজমা স্থানে লার্ভা ধ্বংস করা যায়।

৫. স্মার্ট মশা নজরদারি। (Surveillance Technology)

এখন উন্নত বিশ্বে সেন্সর ও মোবাইল অ্যাপ–ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মশা নজরদারি সিস্টেম ব্যবহার করা হয়।
এগুলো বাতাসে থাকা মশার ঘনত্ব শনাক্ত করে।

বাংলাদেশে কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়:

প্রতিটি ওয়ার্ডে সেন্সর স্থাপন করে মশার ঘনত্বের মানচিত্র তৈরি।
নাগরিকরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মশার উপদ্রব রিপোর্ট করতে পারবে
সিটি কর্পোরেশনের কন্ট্রোল রুম থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
এটি সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই সতর্কবার্তা দেয়।

৬. জৈবিক নিয়ন্ত্রণ—মাছ ও প্রাকৃতিক শত্রু।

লার্ভা-খাদক মাছ (গাপ্পি, টিলাপিয়া) এখনো বিশ্বের বহু দেশে মশা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর।
বাংলাদেশে এটি বিশেষভাবে ব্যবহারযোগ্য।

প্রস্তাবনা:

প্রতিটি থানা/ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট জলাধার চিহ্নিত করে গাপ্পি মাছ ছাড়া
স্কুল, হাসপাতাল, বাজারের জলাধারে বাধ্যতামূলকভাবে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
এটি খরচ কম, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব।

৭. নালা-খাল পুনরুদ্ধার ও স্মার্ট ড্রেনেজ।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ৬০ শতাংশই আসে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নতিতে।
উন্নত শহরগুলোতে স্মার্ট ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবহৃত হয় যেখানে পানি জমা হওয়ার আগেই স্বয়ংক্রিয় পাম্পিং সিস্টেম পানি সরিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশে যা করা যেতে পারে:

মডেল ‘স্মার্ট ড্রেনেজ জোন’ তৈরি
সেন্সরযুক্ত ড্রেনেজ যা বাধা পেলে তাৎক্ষণিক সংকেত পাঠাবে
নালা-খাল দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ সচল রাখা।

৮. Aerial (Air-based) Fogging — আকাশপথে স্প্রে

কিছু দেশে হেলিকপ্টার বা বড় ড্রোন থেকে অত্যাধুনিক মাইক্রো-ফগিং করা হয়, যা বড় শহরে দ্রুত মশা কমায়।

ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য:

আকাশপথে বৃহৎ পরিসরে তাত্ক্ষণিক মশা দমন করা সম্ভব
বিশেষ উৎসব-ঋতু বা প্রাদুর্ভাবের সময় দ্রুত ফলাফল পাওয়া যায়।

৯. AI-ভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা

আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মশার গতিবিধি—এসব তথ্য ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আগেই প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস দেয়।

বাংলাদেশে বাস্তবায়নের প্রস্তাব:

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আবহাওয়া বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মশা পূর্বাভাস সিস্টেম তৈরি।
কোন মাসে, কোন এলাকায় রোগ বৃদ্ধি পাবে—আগেই জানা যাবে
আগাম প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে

বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত করণীয়

১) জাতীয় “মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি টাস্কফোর্স” গঠন।
২) GM মশা ও AGO ফাঁদের পাইলট প্রকল্প চালু।
৩) ড্রোন-ভিত্তিক স্প্রে এবং BTI বিতরণ বৃদ্ধি।
৪) স্মার্ট মোবাইল অ্যাপ ও সেন্সর-ভিত্তিক নজরদারি।
৫) বিশ্ববিদ্যালয়ে মশা গবেষণা ল্যাব প্রতিষ্ঠা।
৬) সারা বছরব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর মশকনিধন কর্মসূচি।
৭) নালা-খাল পুনরুদ্ধার ও স্মার্ট ড্রেনেজ বাস্তবায়ন।

উপসংহার:

বাংলাদেশে মশা দমনের সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান গ্রহণ এখন জাতীয় প্রয়োজন। পুরনো পদ্ধতি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান আর সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি—GM মশা, BTI, ড্রোন, AI, AGO ফাঁদ, স্মার্ট নজরদারি—এসব ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব দ্রুত মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এখন প্রয়োজন দৃঢ় সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নীতি।

সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ মশা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।

লেখক: রাজনীতিবিদ, উন্নয়ন কৌশলবিদ, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন

সারাবাংলা/জিএস/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর