Thursday 05 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ, কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে

ড. মতিউর রহমান
৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৭:৪২

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল উদ্ভাবন মানুষের কাজ, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। একসময় যেসব কাজ সম্পন্ন করতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন হতো, সেসব কাজের অনেক কিছুই এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এসব প্রযুক্তির সম্ভাবনা অসাধারণ। কিন্তু একই সঙ্গে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল কারা পাবে? কারা কর্মসংস্থানের সুযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে? প্রযুক্তির বিকাশ কীভাবে মানুষের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াবে, মানুষের ভূমিকা কমিয়ে দেবে না?

বিজ্ঞাপন

এসব প্রশ্নকে সামনে রেখে ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইউএন স্কিলস ফেস্ট ২০২৬’। ‘পিপল অ্যাট দ্য সেন্টার’ বা ‘মানুষই কেন্দ্রে’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল পরিবর্তনশীল কর্মজগতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা। জাতিসংঘের ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অপারেশনাল ট্রেনিং সার্ভিস আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নিউরোলিডারশিপ ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেভিড রক এবং লেখক ও উদ্যোক্তা সেথ গডিনের মতো ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

এই আয়োজনের মূল বার্তা শুধু জাতিসংঘের কর্মীদের জন্য নয়; বরং বিশ্বব্যাপী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সব প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতি নিজে থেকে মানব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রযুক্তি মানুষের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, কর্মদক্ষতা, মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে।

প্রযুক্তির বিকাশে মানুষের ভূমিকা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পাদন, গবেষণায় সহায়তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা ও সরকারি সেবায় এর ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তির দক্ষতা আর মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন এক বিষয় নয়।

যন্ত্র তথ্য তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের যথার্থতা, প্রাসঙ্গিকতা ও সামাজিক প্রভাব বিচার করার দায়িত্ব মানুষের। এআই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তের নৈতিক ও সামাজিক দায়ভার যন্ত্রের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। একইভাবে স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা মানুষের সহমর্মিতা, বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক উপলব্ধি এবং মতবিরোধ নিরসনের সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না।

ইউএন স্কিলস ফেস্টের আলোচনায় ডেভিড রকের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যেও মানুষের সক্রিয় চিন্তাশক্তি বজায় রাখা। এআই যেন মানুষের চিন্তা ও বিচারবোধকে সম্প্রসারিত করে, তার ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা দুর্বল না করে। শিক্ষা, গবেষণা, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তাই মানুষের দক্ষতা উন্নয়নের অর্থ শুধু নতুন প্রযুক্তি পরিচালনা শেখানো নয়। বরং তথ্য যাচাই, ভুল শনাক্ত, যুক্তি বিশ্লেষণ, নৈতিক বিবেচনা এবং দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করা। ডিজিটাল দক্ষতার পাশাপাশি সমালোচনামূলক চিন্তা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতাও বাড়াতে হবে।

দক্ষতার বৈষম্য নতুন সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে

প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজগতের পরিবর্তন সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করছে না। উন্নত শিক্ষা, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ যাদের রয়েছে, তারা এই পরিবর্তনের সুফল তুলনামূলকভাবে বেশি পাচ্ছে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, গ্রামীণ এলাকার মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সীমিত।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রশিক্ষণসংক্রান্ত বিশ্লেষণেও কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগের অসম বণ্টনের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষের প্রশিক্ষণের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে যারা প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তারাই নতুন দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়তে পারেন।

তরুণদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ আরও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি বা কারিগরি সনদ দিয়ে এখন আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। নিয়োগদাতারা ক্রমেই প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, সৃজনশীলতা ও পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও পরীক্ষার ফলকেন্দ্রিক ব্যবস্থা দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ তৈরি করা, যারা শুধু যন্ত্রের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারবে না; বরং নতুন জ্ঞান অর্জন, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের দক্ষতা পরিবর্তন এবং সমাজের জন্য অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জন্য ইউএন স্কিলস ফেস্টের বার্তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সুবিধা এবং শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।

দেশে উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণ তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছে। এর অর্থ, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়নি।

গ্রামীণ তরুণ, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট। কর্মজীবনে প্রবেশ করতে নারীদের এখনো অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব, চলাচলের সীমাবদ্ধতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পেশাগত যোগাযোগের অভাবের মতো বাধার মুখোমুখি হতে হয়। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ালেই এসব কাঠামোগত সমস্যা দূর হবে না।

বাংলাদেশে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সাফল্য শুধু কতজন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বা কতটি সনদ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রশিক্ষণের পর কতজন কর্মসংস্থান পেয়েছেন, কতজনের আয় বেড়েছে, কতজনের কর্মপরিবেশ উন্নত হয়েছে এবং কতজন টেকসই উদ্যোগ গড়ে তুলতে পেরেছেন, সেগুলোই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। নতুন পেশা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতির চাহিদা বিবেচনায় প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন। যোগাযোগ, আর্থিক সাক্ষরতা, সমস্যা সমাধান, উদ্যোক্তা দক্ষতা ও কর্মক্ষেত্রের নৈতিকতার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

আজীবন শেখার সুযোগ সবার জন্য

স্কিলস ফেস্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হলেই শেখার প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যেতে পারে না। পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে কর্মীদের সারা জীবন নতুন জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ প্রয়োজন। কিন্তু আজীবন শেখার সুযোগ শুধু বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বা উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না।

সরকারের উচিত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা। সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি কলেজ এবং বেসরকারি নিয়োগদাতাদের যৌথভাবে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার স্বীকৃতির জন্য পূর্বে অর্জিত দক্ষতা মূল্যায়ন ও সনদায়নের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে একই ধরনের প্রশিক্ষণ পুনরায় নিতে হবে না।

এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় তাদের বিস্তৃত কার্যক্রমের মাধ্যমে দরিদ্র নারী ও তরুণদের আর্থিক সাক্ষরতা, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। তবে এসব প্রশিক্ষণকে বাস্তব কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক সুযোগের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে।

নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নমনীয় প্রশিক্ষণসূচি, নিরাপদ প্রশিক্ষণকেন্দ্র, শিশু পরিচর্যার সুবিধা, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট এবং উৎপাদনশীল সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব।

প্রযুক্তির ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, ভুল তথ্য, বৈষম্য, নজরদারি এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অসম্পূর্ণ বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি অ্যালগরিদম বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। নিয়োগ, ঋণ প্রদান, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নতুন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে পারে।

বাংলাদেশে এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য স্বচ্ছতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, মানুষের তদারকি এবং ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো প্রযুক্তি শুধু দ্রুত বা সাশ্রয়ী বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। মানুষের অধিকার, সুযোগ ও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাবও বিবেচনা করতে হবে।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল যেন শুধু প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমানো বা মুনাফা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির কারণে কোনো কর্মী কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়লে নিয়োগদাতাদের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে দায়িত্ব নিতে হবে। পরিবর্তিত কর্মসংস্থানের ধরন বিবেচনায় সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে।

উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষই থাকুক

ইউএন স্কিলস ফেস্ট ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের কর্মজগতের পরিবর্তন কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এটি মূলত মানব উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুযোগের সুষম বণ্টনের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থা, যেখানে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ, স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারিক দক্ষতার সমন্বয় থাকবে। এ জন্য সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার, বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষকদের আরও কার্যকরভাবে পাঠদান, স্বাস্থ্যকর্মীদের উন্নত সেবা প্রদান, কৃষকদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ হতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এটি যেন পেশাগত বিচারবোধ, মানবিক সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিকল্প হয়ে না ওঠে।

প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সাফল্য কতগুলো কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা গেল কিংবা কত দ্রুত প্রতিষ্ঠানের ব্যয় কমানো সম্ভব হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, মানুষ কতটা ভালো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে, জীবিকার নিরাপত্তা বাড়ছে কি না, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ হয়তো ক্রমেই বুদ্ধিমান যন্ত্রের দ্বারা প্রভাবিত হবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে ন্যায়সংগত, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার দায়িত্ব মানুষেরই। তাই ‘মানুষই কেন্দ্রে’—এটি যেন শুধু একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের আকর্ষণীয় প্রতিপাদ্য না থাকে; বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ননীতির অন্যতম মৌলিক দর্শনে পরিণত হয়।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী